আত্মনির্ভর লাশ

নদীতে ভেসে উঠছে লাশ! মাথার উপরে চিল শকুনের চক্কর। লাশের ঢেউ আছড়ে পড়ছে নদীর পারে। শ্মশানে কাঠের অভাব। মৃতদেহের দীর্ঘ লাইন। আর নদীর বুকে লাশের অন্তিম যাত্রা। কিন্তু কোন ঠিকানায়? না সত্যিই কোন নতুন ঠিকানা নেই আর। লাশের আবার ঠিকানা কী? ঠিকানা দিয়ে হবেই বা কি? তাই নদীর জলে ভেসে উঠছে ভারতীয় জনতার লাশ। মৃত্যু, ভাইরাসের কারণেই হোক কিংবা অন্য কোন রোগে। মৃত্যুর পিছনে অক্সিজেনের অভাব যে একটা বড়ো অনুঘটক। সেকথা আজ আর লুকানো যাচ্ছে না যাবে না। গোয়াতেই গত দুই দিনে এক সরকারী হাসপাতালে মাত্র ৪৭ জনের মৃত্যু হয়ে গিয়েছে অক্সিজেনের অভাবে। এই চিত্র শত শত হাসপাতালের। এবং প্রায় প্রতি দিনের। খবরে এমনিতেই সব ঘটনা আসে না। তারপর তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার একটা বিষয়ও তো থাকে। থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। ফলে সময় মতো অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে। অন্তত নদীর জলে লাশের অন্তিম যাত্রার ছবি দেখতে হতো না কাউকেই। কোনভাবেই। একশ আটত্রিশ কোটি’র দেশে শ্মশান কিংবা গোরস্থান কম নেই। কিন্তু আজ অভাব দেখা দিয়েছে। প্রথমিক ভাবে মনে হওয়াই স্বাভাবিক মহামারী কিংবা অতিমারীতে এমনটাই তো হওয়ার কথা। এমনটা গতবছর ইতালীতেও কি ঘটে নি? মৃতদেহ বো‌ঝাই ট্রাকের মিছিলের ছবি ফলাও করে আমাদেরকেও তো দেখানো হয়েছিল। দেখানো হয়েছিল গণ কবরের ছবির প্রদর্শনীও। মিডিয়া জুড়ে। অনেকেই সেই ভয়াবহ দৃশ্যে শিহরিত হয়েছিলাম নিশ্চয়। অনেকেই হয়তো মিডিয়ার প্রচার বলে ঠিক বিশ্বাস করতেও চাই নি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাস করে ছিলাম, আমাদের দেশ প্রধানের রাত আটটার প্রতিটি বাণী। কখন কি কি কাজ করতে হবে। কিভাবে করতে হবে। করোনা মোকাবিলায় আমরা তখন প্রত্যেকেই তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিক। তাই আমরা আর খোজ নিতে যাইনি। দেশে নতুন নতুন হাসপাতাল তৈরীর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কিনা? আমারা তো দেখেছিলাম, আমাদের পয়লা নম্বর ঘোর শত্রু সেই চীনে মাত্র কয়েক দিনের ভিতরেই কিভাবে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উহানে দশ হাজার বেডের একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছিল। আমরা কি খোঁজ নিয়েছিলাম, আমাদের সরকার দেশে কয়টি হাসপাতাল নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছে? না, নিই নি। আমরা শুধু বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম। শরীর খারপ হলে স্বশরীরেই কাছে পিঠে’র হাসপাতালে গেলেই একটা বেড পেয়ে যাবো। প্রয়োজন লাগলেই নাকে অক্সিজেনের নল লেগে যাবে। ওষুধের প্রয়োজনে এ দোকান থেকে ও দোকানে ছুটে বেড়াতে হবে না। বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম ছাপ্পান্ন ইঞ্চীর সরকার থাকতে আর চিন্তা কি? ঠিক যে বিশ্বাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনেও আমরা অনেকেই চোখ বুঁজে ডবল ইঞ্জিন সরকারের পক্ষেই সমর্থন জ্ঞাপন করে ছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম, ডবল ইঞ্জিন সরকারই সঠিক ও একমাত্র বিকল্প।

বিস্তারিত পড়ুন

লাশের রাজনীতি

গণতন্ত্রের এক অনন্য চেহারা এই নির্বাচনী হিংসা। সকলেই জানে ভোট আসা মানে বেশ কয়েকটি লাশের মিছিল। এবং সেই মিছিল যত দীর্ঘ হয় ক্ষমতায় উঠে আসা ততই সহজ এবং মসৃণ হয়ে ওঠে। ফলে এই লাশের মিছিল ঠিক কাদের স্বার্থে। কারা এই মিছিলের ডিভিডেণ্ড ঘরে তোলে। সেটাও মানুষের অজানা নয়। কিন্তু তাতেও মানুষের আজ আর কোন বিকার নেই। মানুষ এই লাশের রাজনীতিতেই অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছে। নির্বাচন মানেই ক্ষমতা দখলের লড়াই। আর সেই লড়াই মানেই লাশ পড়বেই। এবং নির্বাচন মিটে গেলেই লাশের মিছিলের স্মৃতি জনমানস থেকে ফিকে হয়ে যাবে। আমরা জীবিতরা একেবারে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দেই ফিরে আসবো স্বচ্ছন্দে। খুব বেশি কিছু হলে, ক্ষমতায় রাজনৈতিক দলের বদল ঘটলে নির্বাচন পরবর্তী হিংসায় রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইয়ে আরও কিছু লাশ পড়তেই পারে। এই যেমন কয়েক বছর আগে ত্রিপুরায় পড়েছিল। সে’ও ক্ষমতা হস্তান্তরের পর্ব মিটে গেলে দিনে দিনে থিতিয়ে আসে। এটাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি। এবং সংবিধান হাতে রেখে, এইভাবেই নির্বাচিত সরকার ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করে। শুধু একটি বিষয়েরই অন্যথা হয় না কখনো। রাজনৈতিক হিংসার বলি হয় একমাত্র নীচুতলার কর্মী সমর্থকরাই। কোন হেভিওয়েট নেতা মন্ত্রী প্রার্থীদের এই হিংসার বলি হতে দেখা যায় না। কারণ তাদের জীবনের দাম অমূল্য। তাদেরকে ক্ষমতায় পৌঁছিয়ে দিতেই না এত রাজনৈতিক হিংসার পরিবেশ সৃষ্টি করা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ফলে তারাই যদি রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়, তবে আর তাদের কি লাভ?

বিস্তারিত পড়ুন