মিডিয়া হাউস এবং মিডিয়া লাইজ

১৯৭৫ সাল। সায়গনের পতন। হোচিমিনের হাতে পরাস্ত হয়ে মার্কিনশক্তি একটি বড়ো শিক্ষা গ্রহণ করে। না, বিশ্বজুড়ে অন্যায় যুদ্ধ সংগঠিত করা থেকে সরে আসার শিক্ষা নয়। আগে বিশ্বজুড়ে মানুষকে টুপি পরিয়ে তারপরে কোন অপকর্মে নামার শিক্ষা। এই শিক্ষাটুকু আমেরিকার আগে ছিল না। ছিল না বলেই ভিয়েতনামে মার্কিন ভণ্ডামির বিরুদ্ধে খোদ মার্কিন মুলুকের জনগণও গর্জে উঠেছিল। ভিয়েতনামে অন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায়, সারা বিশ্বজুড়েই মানুষ সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল এই একটি কারণেই। মানুষের মেধা তখনও স্বাধীন ছিল। মানুষ কিভাবে কোন ঘটনার বিচার করবে। সেই স্বাধীনতাটুকু মানুষ তখনো ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার কাছে বন্ধক রাখা শুরু করে নি। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধে নাস্তানাবুদ হওয়ার পরে। মার্কিন অপশক্তি এই চরম শিক্ষাটুকু গ্রহণ করে। তারা ঠিক করে নেয়। এরপর থেকে যে অপকর্মেই জড়িয়ে পরো না কেন। আগে মানুষকে টুপি পরাও। তারপরে মাঠে নামো। কিন্তু কিভাবে সম্ভব বিশ্বশুদ্ধ মানুষকে টুপি পরানো? সেটি সম্ভব হবে তখনই। যখন অধিকাংশ মিডিয়া হাউসকে কিনে নেওয়া যাবে। মিডিয়া হাউসে, মার্কিন অপশক্তির পক্ষ নেওয়া কর্পোরেট শক্তি অর্থলগ্নী করলেই সেটা সম্ভব। ফলে বিশ্বের বড়ো বড়ো মিডিয়া হাউসে মার্কিন কর্পোরেট শক্তির বিপুল পরিমাণে অর্থলগ্নী করা প্রবল ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর সবচেয়ে বড়ো সুবিধে। সংবাদ মাধ্যমগুলি তখন পরিচালিত হবে সেই সব কর্পোরেট শক্তির অঙ্গুলি হেলন। তারা কাজ করতে থাকবে মার্কিন অপশক্তির স্বার্থে। তারা প্রশ্ন করবে মার্কিন অপশক্তির টার্গেটে যারাই আসবে। একমাত্র তাদেরকেই। কখনোই মার্কিন অপশক্তির কাজকে প্রশ্ন করবে না। এইভাবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন অপশক্তির সমর্থনে একটা জনমত গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড়ো শক্তির জায়গাটা একজায়গায়। সেটি ভাষা। ডলারের ওজনে ইংরেজি ভাষার প্রচলন যত বেশি বিস্তৃত হয়েছে। মিডিয়া হাউসের দৌরাত্ম ততবেশি করে বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে। কিন্তু শুধুই মিডিয়া হাউস নয়। মার্কিন শক্তি গোটা বিশ্ব থেকেই ছেঁকে ছেঁকে মেধাশক্তি’র আমদানি করতে শুরু করে দিল। উন্নতমানের প্রযুক্তিগত শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ সুবিধে দিয়ে সারা পৃথিবী থেকেই প্রতিভা ও মেধাগুলিকে আমেরিকায় টেনে নিয়ে আসতে শুরু করলো। যে মেধাগুলিকে মার্কিন অপশক্তির স্বার্থের পক্ষে রাখা ও মার্কিন স্বার্থের সমর্থনে ব্যবহার করাও সহজ হতে শুরু করলো। যাদের নিজ নিজ দেশ ও জাতির স্বার্থের পক্ষ নেওয়ার কথা। তারা সেই থেকে মার্কিন শক্তির পক্ষ নেওয়া শুরু করে দিল। সেটাই স্বাভাবিক। যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করলো সেই সেই দেশের সমাজ সংস্কৃতিতে। যে সমাজ সংস্কৃতিতে জন্ম নেওয়া প্রতিভাধর মেধাগুলি প্রায় কলুর বলদের মতো মেধা খাটাতে থাকলো মার্কিন কর্পোরেট শক্তির স্বার্থে। যে শক্তির গাঁটছড়া বাঁধা মার্কিন অপশক্তির সাথে। একটু গভীরে গেলেই দেখা যাবে। মার্কিন অপশক্তি আসলে মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থের সম্মিলিত রূপের প্রতিনিধি মাত্র।

বিস্তারিত পড়ুন

তোতাকাহিনী

আমরা অনেকেই টিভি দেখে কাগজ পড়ে গ্লোবালাইজেশনের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে থাকি। এই এক মন্ত্র জপে আমরা নিজেদেরকে আধুনিক বিশ্বের নাগরিক হিসেবে দেখতে চাই। আর এই বিষয়ে আমাদের হাতে তুরুপের তাস। ঔপনিবেশিক ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা। মিডিয়া প্রচারিত তত্ত্বে ইংরেজিই নাকি গ্লোবালাইজেশনের ভাষা। আর আমাদের ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েরা সেই ভাষাতেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ। আবার এই গ্লোবালাইজেশনকে আমরা প্রতিদিন ইনটারনেটে প্রত্যক্ষও করছি। নিমেষের ভিতর বিশ্বের নানান প্রান্তরের সাথে সংযোগ স্থাপন হয়ে যাচ্ছে নিজের ঘরে বা কর্মক্ষেত্রে বসেই। তারপর রয়েছে অনলাইন শপিং। বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে নেটে ঢুকেই কেনাকাটা সারা যাচ্ছে। ফলে আজ আর আমাদেরকে শুধুমাত্র তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক বলে একপাশে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। আমরাও দিনে দুইবেলা উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের সাথে মোলাকাত করতে পারছি। আদান প্রদান করতে পারছি চিন্তা ভাবনা। আর এইসবই আমাদের কাছে গ্লো‌বালাইজেশনের দান বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘরে ঘরে এই গ্লোবালাইজেশনের নামে আমরা দুইবেলা জয়ধ্বনি দিয়ে থাকি। এই গ্লোবালাইজেশনকে আমরা তাই আশীর্বাদ স্বরূপ মনে করে এর সমর্থনে গলা ফাটিয়েও থাকি বেশ। কেউ যদি এর বিরুদ্ধে দুই একটা কথাও তোলে। সমস্বরে আমরা অনেকেই প্রায় রে রে করে তেড়ে উঠি। আমাদের কাছে কোন আলাদিনের আশ্চর্য্য প্রদীপ নেই। কিন্তু এই এক গালভরা গ্লোবালাইজেশন রয়েছে। আমরা একেই দুইবেলা প্রত্যক্ষ করছি ইনটারনেট থেকে সোশ্যাল সাইটে। নেট ব্যাঙ্কিং থেকে অনলাইন শপিং। জুম থেকে ইউটিউবে। মাল্টিন্যাশানল কোম্পানী থেকে ইন্টারন্যাশানাল প্রোডাক্টে। এই যে সারা বিশ্বকে প্রায় হাতের মুঠোয় পাওয়ার সুযোগ। এটিকেই আমরা সাদরে বরণ করে নিয়েছি। প্রতিদিন বিশ্বের সাথে আমাদের সংযোগ বিস্তৃত হয়ে উঠছে। আমরা আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে পড়ছি গ্লোবালাইজেশনের মোহে।

বিস্তারিত পড়ুন

জনপিণ্ড

আমরা কি সুস্থ? আমরা কি স্বাধীন চিন্তা করার মতো ক্ষমতা রাখি? নাকি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় স্বাধীনভাবে কোন বিষয়ে চিন্তা করার পরিশ্রমটুকু বিসর্জন দিয়েই বসে রয়েছি? মিডিয়া যখন যে বিষয়ে আমাদেরকে যেভাবে চিন্তা করতে বলবে। আমরা তখন সেই বিষয়ে সেইভাবেই সেই চিন্তাই করবো। এটাই তাহলে আমাদের পরিণতি! আমরা মিডিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রীত কলের পুতুল। মিডিয়া প্রচারিত বাণী মুখস্থ করে তোতাপাখির মতন সারাদিন সেই মুখস্থ করা বিষয় নিয়ে কিচিরমিচির করছি শুধু। বিগত সাত বছরে ভারতবর্ষের মানুষ এমন ভাবেই মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত যে, তার আর স্বাধীন বিচার শক্তি বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। মিডিয়ার দৌরাত্ম্যে ক্রমাগত ফেক নিউজ ছড়িয়ে মানুষের চিন্তাশক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়া হচ্ছে। ক্রমাগত ভাবে একপেশে সংবাদ পরিবেশন করে করে একটা বশংবদ জনপিণ্ড তৈরী করার কাজ চলছে। এবং ক্রমাগত ভাবেই সঠিক তথ্যগুলি চেপে দেওয়া হচ্ছে, যাতে জনগণ মিডিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ওঠবোস করতে বাধ্য হয়। জনতার হাতে তথ্য যাচাই করার উপায় থাকে না। কিন্তু তথ্যগুলিকে সন্দেহ করার মতো চিন্তা শক্তি থাকে। মিডিয়ার মাধ্যমে সেই চিন্তাশক্তিতে ঘূণ ধরিয়ে দিতে পারলে, যে কোন তথ্যই বিশ্বাস্ করানো সহজ হয়ে ওঠে। এটাই মিডিয়ার আসল কাজ। জনতার চিন্তাশক্তিকে আঘাত করা। সেই শক্তিকে প্রতিদিন আহত করতে থাকা। এইভাবে, একদিন জনতা ঠিক সেই ভাবেই হাসবে। মিডিয়া জনতাকে যেভাবে হাসাবে। জনতা ঠিক সেই ভাবেই কাঁদবে। মিডিয়া জনতাকে যেভাবে কাঁদাবে। জনতাকে নিজের পরিকল্পনার মতো এই কাঁদানো আর হাসানো, রাগানো আর উত্তেজিত করানোর খেলাটার অত্যন্ত সফল প্রয়োগ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম এই শতকের প্রথমেই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের নাটকে। আর সেই নাটকের সূত্র ধরে আফগানিস্তান ইরাকে মার্কীণ মিসাইল বর্ষণে বিশ্বজুড়ে মানুষের জয়োল্লাস মিডিয়ার চরম সাফল্য হিসাবেই ইতিহাসে স্থান করে নিতে পেরেছে।

বিস্তারিত পড়ুন

ছলনার আশ্রয়ে

১৯১৩! রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি। যদি না হতো। তহলেও কি আমাদের প্রাণে কবি একই ভাবে বিরাজ করতেন? না মনে হয়। অবশ্যই অনেকে প্রতিবাদ করবেন। কেউ কেউ সমর্থনও করতে পারেন। কিন্তু সেই নোবেল জয়ের খবরে কলকাতার সেদিনের বুদ্ধিজীবী মহল যেভাবে রেলের বগী ভাড়া করে বোলপুর ছুটে ছিলেন কবিকে অভিনন্দন জানাতে, সেই ভাবে কি কবিকে বরণ করতে এগোতেন? কবি যদি নোবেল না পেতেন? সেদিন কিন্তু কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলের কাছ থেকে তাঁদের অভিনন্দন স্বীকার করতেই অস্বীকার করেছিলেন আমাদের কবি। তাঁদের সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, এই অভিনন্দন কবি’র কারণে নয়। এই অভিনন্দন বিদেশী এক পুরস্কার প্রাপ্তির স্বীকৃতিতে। কবি জানতেন ঔপনিবেশিক মানসিকতার দৌড়। তার প্রকৃতি ও ধর্ম। ইউরোপ আমেরিকার দেওয়া কোন স্বীকৃতিকে ঔপনিবেশিক মানসিকতায় আমরা কিভাবে মূল্য দিই। সেকথা টের পেয়েছিলেন আমাদের কবি। তাই সেদিন কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলকে ফিরিয়ে দিতে দুইবার ভাবতে হয় নি রবীন্দ্রনাথকে। ১৯৫২ সাল। মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল, বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার প্রথম বড়ো মাইলস্টোন যুগসন্ধিক্ষণের সিনেমা ‘নাগরিক’ এর। পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক। পরিবেশকের চক্রান্তে সেই সিনেমা পরিচালকের জীবদ্দশায় মুক্তি পায় নি আর। ১৯৫৫ সালে সেই যুগসন্ধিক্ষণের দ্বিতীয় ছবি পথের পাঁচালী’র ভাগ্যে অবশ্য তেমন কোন দুর্দশা ঘটে নি। বরং বিদেশী সিনেমা জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়ে পুরস্কৃত হওয়ায় বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমায় এক বিশাল ব্যক্তিত্ব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারলেন সত্যজিত রায়। আর সেইরকম বিদেশী কোন স্বীকৃতি না জোটায় স্বদেশেই অপাংতেয় হয়ে পড়ে রইলেন যুগসন্ধিক্ষণের প্রথম পথিকৃত ঋত্বিক।

বিস্তারিত পড়ুন