কে হে তুমি রূপঙ্কর

কে হে তুমি রূপঙ্কর? কারা তোমার গান শোনে? জানো? বাংলা স্কুলে পড়া আর মিড ডে মিল খেয়ে বড়ো হওয়া কিছু কুয়োরব্যাঙ বাঙালি। আরে বাঙালিকে তুমি বাঙালি হতে বলছো? বাঙালি কবে বাঙালি ছিল? আগে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসটাও ভালো করে পড়ে দেখোনি, বোঝা যাচ্ছে। শোন হে রূপঙ্কর, বাঙালি কোনদিনও বাঙালি ছিল না। আর হবেও না। কুকুরের লেজ কখনো সোজা হতে দেখেছো? বাঙালি চিরকাল ভারতীয় ছিল। ভারতীয় থাকবে। হ্যাঁ, আর যার পেটে যত বেশি ইংরেজি বিদ্যে গজগজ করবে। সে অবশ্য তত বড়ো আন্তর্জাতিক হবে। তা হোক। ক্ষতি কি? কিন্তু তাই বলে বাঙালিকে বাঙালি হতে বলা? তোমার স্পর্ধা দেখেই তো বাংলা শুদ্ধ বাঙালি অবাক! এ আবার কোথা থেকে কোন রূপঙ্কর পাল এলো? বাঙালিকেই বলছে বাঙালি হতে? জানো না, বাঙালি হওয়া মানে ‘মানুষ না হওয়া’। তবে শুনে রাখো। স্বয়ং বিশ্বকবিই বলে গিয়েছেন। ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি’। বাঙালি সে’কথার যে অর্থই করুক না কেন। বাঙালি বরাবর মানুষ হয়ে ওঠার সাধনায় মগ্ন। সে কেন বাঙালি হয়ে পড়ে থাকতে যাবে? উত্তর কলকাতার এঁদো গলির হরিপদ কেরানীর মতো? আর মানুষ হয়ে ওঠার সেই নিরন্তর সাধনারত বাঙালিকেই কিনা তুমি বাঙালি হতে উপদেশ দিচ্ছি? বাঙালি গর্জে উঠবে না?

কি হে রূপঙ্কর! আসমুদ্র হিমাচল বাঙালির সেই গর্জন শুনতে পাচ্ছো তো। নাকি? তোমার নামে চারিদকে তো ঢিঢি পড়ে গিয়েছে। আর সোশ্যাল মিডিয়া? সেখানে তো তোমার নামে ঢ্যাঁড়া পেটানো শুরু হয়ে গিয়েছে। কান পাতো রূপঙ্কর। চোখ খোল রূপঙ্কর। তাকিয়ে দেখো চোখ মেলে। এই বাংলায় তোমাদের মতো কুয়োরব্যাঙেদের সম্বন্ধে বাঙালির রায় কি, সেটা এবার বোঝার চেষ্টাটুকু অন্তত করো‌। আর কবে বুদ্ধির গোড়ায় জল ঢুকবে তোমাদের বাবা? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়? ‘হু ইজ কে কে?’। একজন ন্যাশানাল সিঙ্গার সম্বন্ধে এত তাচ্ছিল্য? এও কখনো বাঙালির সহ্য হয়? তুমি জানো না, বাঙালির ধর্ম প্রতিদিন দুইবেলা ডন বৈঠক দিয়ে শরীর গঠন করার মতো করে দুইবেলা হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের কালচারের সাধনা করতে করতে ভারতীয় হয়ে ওঠা? ন্যাশানাল হয়ে ওঠা? তোমার সেই সাধনা নাই থাকতে পারে। তাই বলে দুইবেলা আপামর বাঙালিরও সেই সাধনা থাকবে না? কে হে তুমি রূপঙ্কর! তুমি ঠিক করে দেবে? বাঙালি অন্ধের মতো বোম্বাইমার্কা কালচারের পিছনে না ছুটে বাঙালি হয়ে উঠবে? তোমাদের মতো পাতি বেঙ্গলী সিঙ্গারদের গান শোনার জন্যে? পারবে তুমি নজরুল মঞ্চে লম্ফঝম্ফ করতে করতে গান গাইতে? আরে বাবা, গান আর হারমোনিয়াম নিয়ে হেমন্ত মান্নাদের মতো গাওয়ার বিষয় নেই। গান হলো মঞ্চ কাঁপানো তাণ্ডব নৃত্য। জ্যাকসন শো দেখোনি। পারবে সুরে অবিচল থেকে অমন জগঝম্প গাইতে?

না, শুধু মঞ্চে উঠে লম্ফঝম্ফ করলেই তো আর হবে না। গাইতে হবে জাতীয় ভাষায়। জানো‌ না সংবিধানে থাকুক আর নাই থাকুক। বাঙালির হৃদয়ে আর চেতনায় হিন্দীই ভারতের জাতীয় ভাষা। সেই ভাষায় গান গাইতে হবে। উঁহু কলকাতায় বসে নয়। কে দেখবে তোমার কলকাতার শো? গাইতে হবে। কল্কে পেতে হবে খোদ বোম্বাইতে গিয়ে। বোম্বাইতে আজ যে ট্রেণ্ড সেট হয়। কলকাতা তা কাল নকল করার চেষ্টা করে। ইণ্ডিয়ার কালচারাল ক্যাপিটাল বলে কথা। হুঁহুঁ বাবা। তবেই তুমি জাতে উঠবে। মিঠুনকে দেখে শেখো। শানুকে দেখে শেখো। শোন হে রূপঙ্কর। হেমন্ত মান্নাও কিন্তু সেই বোম্বাই মুলুকে গিয়েই তবে জাতে উঠেছিল। না হলে কজন বাঙালি শুনতো অমন প্যানপেনে বাংলা গান? গান গাইতে গাইতে কে কে’র মতো মঞ্চ থেকে তিন ফুট উঁচুতে লাফ দিয়ে উঠতে হবে। তবেই না তুমি ন্যাশানাল সিঙ্গার। তোমার এই মাছভাতের কালচার দিয়ে ওসব হবে না। সে তুমিও জানো। আর জানো বলেই না তোমার এত গাত্রদাহ কে কে’ কে নিয়ে। সাধে আজ সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তোমার নামে পরশ্রীকাতরতার ‘ফার্স্ট ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট’ জমা পড়ে গিয়েছে? দেখ দেখ রূপঙ্কর। ভারতীয় তথা আন্তর্জাতিক বাঙালি আজ তোমার সম্বন্ধে কি রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেই তুমিই কিনা বাঙালির কাছে কুয়োরব্যাং হয়ে থাকার উপদেশ ঝাড়তে গিয়েছিলে কাল? বাঙালি বোম্বাই মার্কা কালচারের নেশা ছেড়ে দেবে? বোম্বের পিছনে ঘোরা বন্ধ করে দেবে? কে হে তুমি রূপঙ্কর? বাঙালিকে উপদেশ ঝাড়তে আসো? কোনদিন দেখেছো প্রভুভক্ত সারমেয় প্রিয় প্রভুর পায়ের কাছ ছাড়া অন্যত্র কোথাও ঘুরঘুর করেছে?

একজন ন্যাশানাল সিঙ্গার সম্বন্ধে ভালোমন্দ বিচার করার কে হে তুমি? গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। ভারতীয় হয়ে ওঠার সিলেবাসের পাঠ নিয়েছো কোনদিন? নিলে জানতে, একজন ন্যাশানাল সিঙ্গার আর আঞ্চলিক গাইয়ের ভিতরে কিরকম আকাশ পাতাল ফারাক। কি শ্রদ্ধায়। কি সম্মানে। কি জনপ্রিয়তায়। অমনি অমনি কে কে’ রা এই বাংলায় বাঙালির হৃদয়ের সিংহাসনে এমন একান্ত ভাবে অভিষিক্ত হয় না। এ দুই এক দশকের সাধনায় হয় না। দুই এক বছরের সিলেবাস পাঠ করেও হয় না। দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় হয়ে ওঠার সিলেবাসের নিরন্তর পাঠ নিতে নিতে হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের কালচারে দীক্ষিত হতে হতে তবেই না মঞ্চ কাঁপানো তিন ফুট উঁচুতে লাফিয়ে উঠে গান গাওয়া শিল্পীরাই বাঙালির হৃৎপিণ্ড জুড়ে বসে থাকে। থাকার সুযোগ পায়। এই যে বাংলা জুড়ে রফিকণ্ঠ লতাকন্ঠীদের পসার দেখ‌ো। এমন শুনেছো কখনো বোম্বাই মুলুক জুড়ে হেমন্তকণ্ঠ সন্ধ্যাকন্ঠীদের পসার হয়েছে? এটাই সেই ভারতীয় হয়ে ওঠার সিলেবাস। দুইবেলা ডন বৈঠক দাও আর নাই দাও। এই সিলেবাসের ভিতর দিয়েই তোমাকে ভারতীয় হয়ে উঠতে হবে। না উঠলে কি করে টের পাবে তুমি বঙালির পালস্? কি করে বুঝতে পারবে তুমি। কি রকম চরম আঘাত দিয়েছো আপামর বাঙালিকে। বাঙালি হতে বলে। বম্বের পিছনে ছোটা বন্ধ করতে বলে। বাংলা কাঁপানো কে কে’র মতো একজন ন্যাশানাল সিঙ্গারকে কে- কে কে’ বলে?

সেই কে কে’ কে নিয়ে বাঙালির উত্তেজনা হবে না? শোন হে রূপঙ্কর। পরপর দুদিন নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠান করো। একদিন তোমরা যারা পাতি বাংলায় গান বাঁধো। গান গাও। আর একদিন বোম্বাই মিউজিক ইণ্ডাস্ট্রীর কিছু ঝড়তি পড়তি বাতিল স্টার। দেখতে পাবে টিকিটের হাহাকার কোনদিনের অনুষ্ঠানের জন্য হয়। আর এ’তো স্বয়ং কে কে। বঙ্গের সঙ্গীত সমাঝদারদের হৃদয়ের সম্রাট। মঞ্চ জুড়ে তিন ফুট উঁচুতে লাফিয়ে উঠে গান শোনানোর ক্ষমতাধর বোম্বাইশিল্পী। হুঁহুঁ বাবা রূপঙ্কর। এসব শিল্পীর জাতই আলাদা। তোমাদের মতো পাতি বাংলায় গান বাঁধা গান গাওয়া গাইয়েরা এসবের কদর বুঝবে না। বুঝতে গেলে আগে ভারতীয় হয়ে উঠতে হবে। বোম্বাই মার্কা কালচারে মানুষ হয়ে উঠতে হবে। তবে তো তুমি বুঝতে পারবে কে সুরে রয়েছে। আর কে সুরে নেই। কে শিল্পী আর কে পার্ফরমার। কার জন্য বাঙালির উত্তেজনা হবে। আর কে মঞ্চে উঠলে বাঙালি হাই তুলবে। শোন ভাই রূপঙ্কর। জনপ্রিতার বাজারদরেই শিল্পীর আয়ু। জনপ্রিতার বাজারদরেই শিল্পের প্রতিষ্ঠা। জনপ্রিতার বাজাদরেই সঙ্গীতের আরাধনা। আর তুমি কিনা বলছো বাঙালি আর কতদিন বোম্বাইয়ের পিছনে ঘুরবে? আসমুদ্রহিমাচল জনপ্রিয়তা নিয়ে বাঙালির হৃদয়ে বোম্বাইয়ের শিল্পীদের প্রতিষ্ঠা। কে হেঁড়ে গলায় আসর মাৎ করছে। আর কে হনুমানের মতো লাফাতে লাফাতে মঞ্চ কাঁপাচ্ছে। সেটা কোন বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা বাঙালির হৃদয়ে কে কে কত বেশি জনপ্রিয়। বাঙালির আবেগে কে কে আদরণীয়। তুমি রূপঙ্কর, বাঙালির সেই ভাবাবেগে আঘাত দিতে পারো না। নিশ্চয়। তোমাকে বাঙালির ভাবাবেগের ইতিহাস ভুগোল বুঝতে হবে। সেই ভাবাবেগের কুলে কুলে দাঁড় টানতে পারলে। তবেই কিন্তু তুমি শিল্পী। কিংবা বুদ্ধিজীবী। আর সেই সামান্য বুদ্ধিটুকু না থাকলে তুমি রূপঙ্কর। ভেংচিকাটা বাঙালির মুখোমুখি তো তোমাকে হতেই হবে ভাই। সেই বাঙালিকেই তুমি বাঙালি হতে অনুরোধ করছো? তাজ্জব কি বাৎ।

১লা জুন’ ২০২২

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s