তোলাবাজির খপ্পরে

আপনার বাগান থাকতেই পারে। সেই বাগানে আপনি ফুলের নার্সারি করুন কি সবজী চাষ করুন। ভালো কথা। বাগান পরিচর্যার উদ্দেশে আপনাকে নিজের বাগানে নিজের পয়সায় কেনা মাটিও ফেলতে হতেই পারে। যত খুশি মাটি ফেলুন। তাতে কে বাধা দিচ্ছে? কিন্তু তাই বলে স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যদের দাবি মতো দুলক্ষ টাকা তোলা দেবেন না! এ কেমন কথা? মগের মুলুক নাকি? বাগান আপনার হতে পারে। সেই বাগানে মাটি কেনার প্রয়োজনও আপনার হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে আপনি হাজার হাজার টাকার মাটি কিনবেন। আর লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা দেবেন না সেটা হয় কোন যুক্তিতে। আপনার বাগানটা আপনার। কিন্তু তাই বলে যে অঞ্চলে আপনার বাগান কিংবা বসত। সেই অঞ্চলটা তো আর আপনার বাপের সম্পত্তি নয়! সেই অঞ্চলের একটি নির্বাচিত পঞ্চায়েত কিংবা ওয়ার্ড রয়েছে। সেই পঞ্চায়েত কিংবা ওয়ার্ড যাদের দখলে। তাদের মর্জির তো একটা দাম রয়েছে। আপনি একতলা বাড়ির মাথায় দোতলা তুলবেন কিংবা বাগানে ফুলের চাষ করার জন্য মাটি কিনে ফেলবেন। আর স্থানীয় পঞ্চায়েত কিংবা ওয়ার্ডের নির্বাচিত শাসকদল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখবে? তাহলে আর কিসের পরিবর্তন?

ফলতার দেবীপুর গ্রামের ঘটনা নিয়ে সংবাদ মাধ্যম যতই হইচই করুক। পঞ্চায়েতই হোক আর পুরসভা হোক। শাসকদলের নেতা এবং নেত্রী, বাম হাত ও ডান হাত, চুনোপুঁটি থেকে রাঘোববোয়াল। কেউ তোলা না তুলতে পারলে। দল টিকে থাকবে? কার ঠেকা পড়বে সেই দলের হয়ে মিছিলে ভিড় জোগার করতে। যে দল সরকারে থেকেও তোলা আদায়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে না? জেলা পরিষদ হোক। হোক কর্পোরেশন। পুরসভা কিংবা গ্রাম পঞ্চায়েত। যে অঞ্চলেই হোক না কেন। শাসকদলের কাণ্ডারীদের তোলা না দিলে চাঁটি তো খেতেই হবে। হাতে না মারলেও ভাতে মারবে। ভাতে মারার থেকে হাতে মারা ভালো নয় কি? ভাতে মারলে প্রাণ রক্ষাই দায়। হাতে মারলে তবু হাত পা ভেঙ্গে। মাথা ফেটেও বেঁচে থাকার একটা চান্স থাকে। ফলে ফলতার দেবীপুরের ঘটনা নিয়ে অযথা হই এবং চই করার বিশেষ কোন কারণ ঘটেনি।

কুন্তল মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী’র ভাগ্য ভালো। বাঁশপেটাই খান। আর গলা ধাক্কা খান। সাধের প্রাণটি নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাতে তো পেরেছেন। নিজেদের বাড়িতে নিজেরা ফিরতে পারছেন না। তাই নিয়ে এত কাঁদাকাটিই বা করার কি হয়েছে? আপনি গ্রামেও থাকবেন। আবার পঞ্চায়েত প্রধানের দাবি মতো দুই লক্ষ টাকা তোলা দেবেন না। মামার বাড়ি নাকি? বেচারা পঞ্চায়েত প্রধান। মানুষের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। দেশসেবার কাজে নিয়োজিত। তারও তো শখ আহ্লাদ হয়। ভাদু শেখের মতো। আনারুলের মতো পেল্লায় প্রাসাদ না হোক। একটা অট্টালিকা বানিয়ে তোলার। তারপরে রয়েছে সেই সাবধান বাণী! ‘শুধু নিজে খেলে হবে? সবাইকে দিয়ে খেতে হবে’। নিহত ভাদু শেখের স্ত্রী’র সেই মর্মন্তুদ বিলাপ, আশা করা যায় রাজ্যবাসীর কানে এখনো বাজনা বাজানো বন্ধ করে দেয়নি। ‘ও তো শুধু একাই খেতো না। সবাইকে দিয়ে খেতো। তাও ওকে মেরে দিল’। দিয়ে খেয়েও যেখানে বেঁচে থাকার কোন গ্যারান্টি নেই। কখন কে কোথায় কার জীবনের ভবলীলা সাঙ্গ করে দেবে। কেউ জানে না। সেখানে তোলা আদায়ের টাকার অঙ্কটা হাজার ছাড়াবে না? এও আবার হয় নাকি? দুই লক্ষ তো তাও কমই চেয়েছে। এই বাজারে দুই লক্ষ টাকার কতই বা আর মূল্য? সেই টাকাও দেবো না। আবার বাগানে মাটিও ফেলবো! মগের মুলুক।

কে না জানে ঐ টাকা বাঁশপেটা করা সেই পঞ্চায়েত প্রধান একা খেতো না। ফলতার দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাকি সদস্যদের অধিকাংশই সেই টাকার ভাগ পেত। তবেই না দলে ভারি হওয়া। যে কারণে কুন্তল মজুমদারের স্ত্রীকেও, স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে ঘাড় ভেঙ্গে হাসপাতালে শয্যা নিতে হয়েছিল দীর্ঘদিন। না, পরিবর্তনের আশীর্বাদ ধন্য এই সময়ে কারুরই একা খাওয়ার উপায় নেই। এখন সবাইকে দিয়ে খেতে হবে। সেই দেওয়ার ভাগ বাঁটোয়ারায় গরমিল হলে। পরিণতি ভাদু শেখ। কে আর শখ করে ভাদু শেখ হতে চায়। ফলে দিয়ে খাওয়ার এই কার্যক্রমে তোলা আদায়ের টাকার পরিমাণ তো লক্ষে পৌঁছাবেই। না হলে তোলা আদায়ের পিরামিড স্ট্রাকচার ভেঙে পড়তে বাধ্য। দলের ভিতরেই তোলার ভাগ নিয়ে মুষলপর্ব শুরু হয়ে যাবে। শাসন ক্ষমতা তখন ধরে রাখাই দায়। ফলে দিয়ে খাওয়ার এই রীতি এবং নীতি। দিয়ে খাওয়া ও খাওয়ানোর এই গোটা স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে রয়েছে তোলা আদায়ের টাকার অঙ্কের পরিমাণের উপরেই। সেই পরিমাণ বছরে বছরে বাড়তেই থাকবে। মুদ্রাস্ফীতির হারের সাথে পাল্লা দিয়ে। পাল্লা দিয়ে না বাড়তে থাকলে। সবাইকেই সন্তুষ্ট করে রাখা সম্ভব হবে না। দিনের শেষে গোটা দলকে ধরে রাখতে গেলে। সবাইকে সন্তষ্ট করে রাখার দরকার আছে বই কি।

আপনি পরিবর্তন চাইবেন। আর যারা সেই পরিবর্তন আনলো। তারা তোলা চাইলেই দোষ? সংবাদ মাধ্যমগুলির কোন নৈতিক দায় নেই? নৈতিক দায়িত্ব নেই। রাজ্যবাসীকে তাদের করনীয় ও প্রদেয় সম্বন্ধে সজাগ ও সতর্ক করে দেওয়ার? যিনি বা যাঁরা ফলতার দেবীপুর গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানের বাঁশপেটা করতে থাকা ছবিটি রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বা তাঁরাই কিন্তু সেই নৈতিক দায় ও দায়িত্বটুকু পালন করে আমাদের সকলকে ধন্য করেছেন। গ্রামেই থাকি। আর শহরে। কিংবা নগরে। আমরা যাঁরা কপালের জোরে এই রাজ্যের বাসিন্দা। তাঁরা নিজেদের দায় ও দায়িত্ব সম্বন্ধে এবার সচেতন হয়ে উঠতে পারবো। সৌজন্যে সেই ভাইরাল ভিডিয়‌ো। দুই লক্ষই হোক। আর দুই কোটি। পঞ্চায়েত প্রধানই হোক আর পুরপ্রধান। কিংবা তাঁদের সাঙ্গো এবং পাঙ্গোরা। তোলা চাইলে দিতে হবে। আর, না দিলে কি হবে তার পরিণতি? ভাইরাল ভিডিয়োয় তারই ডেমনোস্ট্রেশন দেওয়া রয়েছে। তাতেও সন্দেহ থাকলে। জিজ্ঞেসা করে নিন। জেনে নিন। তোলা আদায়ের ণত্ব এবং ষত্ব। ফলতার দেবীপুর গ্রামের মার খাওয়া সেই দম্পত্তিকে। কুন্তল মজুমদার। জুঁই মজুমদার। গ্রামছাড়া হয়ে আত্মীয়দের বাড়িতে যাঁরা আত্মগোপন করে রয়েছেন।

১৯শে এপ্রিল’ ২০২২

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s