ইউরোপের স্বাধীনতা

৭ই মার্চ’ ২০২২। ইউক্রেনে রাশিয়ান অভিযানের দ্বাদশ দিন। ইউরোপ জুড়ে তেল আর গ্যাসের মূল্যে আগুন লেগেছে। যদিও রাশিয়ার বিরুদ্ধে জারি করা স্যাংশানের সরাসরি প্রভাব পড়া শুরু হয়নি এখনো। আরও কঠোর স্যাংশান জারি করার তোড়জোড় চলেছে। চলেছে হুমকি দেওয়ার ধারাবাহিক পালা। ইউরোপের মানুষের উপরে মুদ্রাস্ফীতির এই অভিশাপ নামিয়ে এনেছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন। নামিয়ে এনেছে আমেরিকা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জাড়ি করে। ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও অতি দ্রুত দুর্ভোগ নেমে আসতে চলেছে। কেউ জানে না। এই দুর্ভোগ কতগুণ বৃদ্ধি পেতে চলেছে। কেউ জানে না। মানুষ কিভাবে কোন পথে এই দুর্ভোগের সাথে মোকাবিলা করতে পারবে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি না করলে। অবস্থা এত দ্রুত খারাপ হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তাতে মার্কিন-ন্যাটো শক্তির স্বার্থরক্ষা হতো না। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম ভাবে চরম মুদ্রাস্ফীতি তৈরী করে মানুষকে রাশিয়া বিরোধী করে তোলার এমন সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া যেত না। এখন মানুষকে বোঝানো সহজ হয়ে গেল। মানুষের দুর্ভোগের পেছনে রাশিয়া। অথচ এই কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতির ফলে মূলত মার্কিন এবং ইউরোপের ধনকুবেরদের সম্পদ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে খুব কম সময়ের ভিতরে। অতিরিক্ত এবং অনৈতিক মুনাফা বৃদ্ধি করে কয়েকজন ধরনকুবেরের সম্পদবৃদ্ধির এমন চমৎকার পরিকল্পনার নাম গণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধ। রাশিয়ান আগ্রাসান প্রতিরোধ করার অহিংস পদ্ধতি।

সেই লক্ষ্যেই রাশিয়ান সংবাদ মাধ্যমগুলিকে ইউরোপ আমেরিকা সহ এশিয়া আফ্রিকায় সম্প্রচার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। মানুষ রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যমগুলির বক্তব্য ও প্রচারিত সংবাদ শুনতে পারলে। ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার প্রচারিত সংবাদের সাথে তুলনা করে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে। কতটা সত্য আর কতটা অসত্য, বুঝতে পারতো। না, মানুষের স্বাধীন চিন্তা করার কোন অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। মানুষকে ঠিক সেই সংবাদই দেওয়া হবে। যে সংবাদের ভিতর দিয়ে ইউরোপ আমেরিকার ধনকুবেরদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। ফলে যেভাবেই হোক ইউক্রেনের যুদ্ধটাকে অতি দ্রুত থামাতে দেওয়া যাবে না। কিংবা যুদ্ধ থেমে গেলেও। রাশিয়া যতদিন না ইউক্রেনের মাটি ছাড়ছে। ততদিন অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির উর্ধগতি বজায় রাখতে হবে। এমনও হতে পারে। রাশিয়া ইউক্রেন ছেড়ে চলে গেলেও। এই অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কিছুদিন জারি রেখে লাভের গুড় পুরেপুরি চেটে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

ফলে ইউক্রেন সঙ্কটে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত পরিস্কার। ইউরোপের দেশগুলিকে আজ আর কোনভাবেই স্বাধীনদেশ বলা সম্ভব নয়। তাদের এই স্বাধীনতাকে ন্যাটো গোষ্ঠীতে বোতলবন্দী করে ফেলেছে আমেরিকা। আমেরিকার নির্দেশই ন্যাটোর চালিকা শক্তি। আর ন্যাটোভুক্ত তিরিশটি দেশের ওঠা বসা সেই শক্তিরই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই নিয়ন্ত্রণের সমারিক দিকটা দেখে ন্যাটো। যার মাথায় বসে সেই আমেরিকা। আর অর্থনৈতিক দিকটা দেখে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন। সেই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের তিরিশটি দেশ ন্যাটোর নিয়ন্ত্রণে থাকায়। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণও সেই আমেরিকার হাতেই। এই ন্যাটোর হাতেই ইউরোপ তার সামরিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে বসে রয়েছে্। এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখযোগ্য, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলিতে আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করে রাখলেও। সেই অস্ত্র ব্যবহারের স্বাধীনতা শুধুমাত্র আমেরিকা ফ্রান্স আর ব্রিটেন ছাড়া আর কোন দেশের হাতে নাই। এবং তিরিশটি দেশকেই মার্কিন মেরিনদের থাকা খাওয়া এবং রাজত্ব চালানোর জন্য অঞ্চল ছেড়ে দিতে হয়েছে। মজার বিষয়, আমেরিকার সৈন্যদের নিজ নিজ দেশে বসিয়ে রেখে। আমরিকার নিয়ন্ত্রণে অস্তসম্ভার রেখে দিয়ে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশের নাগরিক নিজেদের স্বাধীন মনে করে। ইউরোপীয়ানদের এইরকম দুর্দিন ১৯৪৫ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমে সেই নিয়ে কোন আলোচানা চলে না।

আর ইউরোপীয়ানদেরকে দিবানিদ্রায় এইভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্যেই অষ্টপ্রহর সজাগ ও সতর্ক এবং সক্রিয় ওয়েস্টার্ন মিডিয়া। ফলে কোনভাবেই ওয়স্টার্ন মিডিয়ার প্রচারিত সংবাদের বাইরে অন্য পক্ষ কিংবা নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমগুলির প্রচারিত সত্য ও তথ্য কোনভাবেই ইউরোপীনাদের শুনতে ও দেখতে, ভাবতে ও বুঝতে দেওয়া যাবে না। দেওয়া হবে না। এটাই আমেরিকার বিধান। সেই বিধানের বাইরে ইউরোপ নয়। বাকি বিশ্বও নয়। তাই রাশিয়াকে জব্দ করার নামে আসলেই ইউরোপীনদের জব্দ করে রাখার জন্যেই রাশিয়ার প্রচারিত সংবাদের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাহলে বিষয়টা বেশ পরিষ্কার। ইউরোপীয়ানদের সামরিক স্বাধীনতা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। এবং চিন্তা চেতনার স্বাধীনতা হরণ করে রেখেছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। রেখেছে ইউরোপীয়ানদের বন্ধু সেজে। অর্থাৎ, ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানে আসল লাভ কিন্তু সেই আমেরিকারই। ফলে এই যুদ্ধ কতদিন চলবে। তার মূল নিয়ন্ত্রণও সেই আমেরিকার হাতেই। রাশিয়া ফিরে গেলেই যে যুদ্ধ বন্ধ হবে নিশ্চয়তা নাই তার।

৭ই মার্চ’ ২০২২

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s