বৈবাহিক ধর্ষণ সমাজ ও আইন

আপনার স্ত্রী কি আপনার সম্পত্তি? আপনিও কি মনে করেন আপনি আপনার আপন স্বামীর সম্পত্তি? ভারতবর্ষের সুপ্রীম কোর্ট অবশ্য গতবছর মার্চ মাসে একটি মামলার রায়ে জানিয়ে দিয়েছে, স্ত্রী কখনোই স্বামীর অধিকৃত সম্পত্তি নয়। শুধু তাই নয়। রায়ে আরও বলা হয়েছে, স্ত্রী’র ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাও বেআইনি কার্যকলাপ। এখন সুপ্রীম কোর্টের এই রায় নতুন কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্বামী যদি তার নিজের স্ত্রী’র ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে যৌন মিলনে বাধ্য করে, তবে তো সেটি অবশ্যই ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে। এদিকে ভারতীয় আইনে দাম্পত্য ধর্ষণ আবার দণ্ডনীয় অপরাধ নয়। গত বছরেই কেরল হাইকোর্টের একটি রায়ে বলা হয় বৈবাহিক ধর্ষণ দণ্ডনীয় অপরাধ না হলেও বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য যুক্তিগ্রাহ্য একটি কারণ হতে পারে মাত্র। এখন আপনি কি করবেন? কোন দিকে যাবেন? স্ত্রীকে আপন সম্পত্তি মনে করা কিন্তু দেশের সুপ্রীম কোর্টের বিধান অনুযায়ী বেআইনী। এবং স্ত্রী’র ইচ্ছের বিরুদ্ধে যৌন মিলনে বাধ্য করাও বেআইনী। এবং সেটি আইনের ভাষায় বৈবাহিক ধর্ষণ। এখন আপনি যদি পর পর এই বেআইনী কাজগুলি করেনও। তাহলেও কিন্তু ভারতবর্ষের আইনে আপনাকে কোন শাস্তি দেওয়ার বিধান নাই। বিষয়টি বেশ মজার। খুব বেশি হলে আপনার স্ত্রী আপনার বিরুদ্ধে শারীরীক নির্যাতন, ইচ্ছের বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার অভিযোগে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারেন। অর্থাৎ পরকীয়া শুরু করলে নিজের স্ত্রী’র হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে একজন স্বামী বুদ্ধি করে পরপর এই পথে এগোতেই পারেন। স্ত্রী’ই তখন বাপ বাপ করে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য উঠে পড়ে লাগতে পারে। ভারতবর্ষের আইন কিন্তু আপনার পাশেই।

নিশ্চয়ই আপনার স্ত্রী আপনার সম্পত্তি নন। তাঁকে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে যৌন মিলনেও আপনি বাধ্য করতে পারেন না। দুইই বেআইনী। এবং করলে সেটি বৈবাহিক ধর্ষণ, শারীরীক নিগ্রহ বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু সেটি কোন দণ্ডনীয় অপরাধও নয়। যতক্ষণ তাঁর সাথে আপনি আইনত দাম্পত্য সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন। হ্যাঁ স্ত্রী আপনার বিরুদ্ধে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করতে পারে বৈবাহিক ধর্ষণ ও শারীরীক নিগ্রহের অভিযোগে। এটাই ভারতবর্ষ। এটাই ভারতবর্ষের আইন। আর এই আইনের ফাঁক গলে প্রতিদিন কত স্ত্রী তার স্বামীর হাতে শারীরীক নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন, তার কোন পরিসংখ্যান রাখা হয় না, করনো সংক্রমণের পরিসংখ্যানের মতো। রাখলে বোধকরি করোনা সংক্রমণের হারকেও বহু পিছনে ফেলে দিতে পারতো।

আবহমান কাল ধরে ভারতবর্ষের অধিকাংশ জাতির সমাজ ব্যবস্থায় স্ত্রী মানেই স্বামীর বৈবাহিক সম্পত্তি বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে। আসছে বলেই আদালতকে রায় দিতে হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। তাও স্বাধীনতার এতগুলি দশকের পরে। এখন এই যে একটি সামাজিক মানসিকতা। বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হলেই স্ত্রী’ স্বামীর সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে যায়। এই মানসিকতাই পুরুষের মনস্তত্ত্বে নারীকে ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করে ফেলে। যার চুড়ান্ত পরিণতি ধর্ষণ থেকে গণধর্ষণ। যে কোন ভাবেই হোক, একটি মেয়ের কপালে খানিকটা সিঁদুর ঢেলে দিতে পারলেই যেন সেই মেয়েটির শরীরের দখল নিয়ে নেওয়া যায়। আবহমান কাল ধরে চলে আসা এই ধরণের মানসিকতার বদল ঘটাতে গেলে প্রয়োজন সমাজ সংশোধনের। আইন করে কতটা সমাজ সংশোধন করা যায়, সেটাও একটা বড়ো প্রশ্ন। হ্যাঁ ব্রিটিশ শাসনে আইন করে সতীদাহ প্রথা অবলুপ্ত করা গিয়েছিল ঠিক। কিন্তু সেও রাতারাতি হয়নি। অনেক সময় লেগেছে। ফলে, আজও যে আইন করে দিলেই রাতারাতি ঘরে ঘরে বিবাহিত রমণীরা সুরক্ষিত হয়ে যাবে সেটাও নয়। সময় তো লাগবেই। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে, বৈবাহিক ধর্ষণকে ভারতীয় আইন স্বীকার করে নিলেও। তাকে এখনো দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচনা করতে সক্ষম হয়নি। এখন প্রশ্ন, বৈবাহিক ধর্ষণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে স্বীকার না করলে কি এই ঘটনা রোধ করা সম্ভব? আদালতের রায় অনুযায়ী শুধুমাত্র বিবাহ বিচ্ছেদর যুক্তিগ্রাহ্য কারণ হিসাবে বৈবাহিক ধর্ষণকে চিহ্নিত করলেই কি এই ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব? এবং আরও বড়ো প্রশ্ন, বৈবাহিক ধর্ষণকে ভারতীয় আইন কেন দণ্ডনীয় অপরাধ বলে স্বীকার করতে পারছে না এখনো।

সংবাদ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ইউপিএ শাসনামলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জে এস বর্মার নেতৃত্বাধীন কমিটি এই বৈবাহিক অর্থাৎ দাম্পত্য ধর্ষণকে ফৌজদারী অপরাধের তালিকায় রাখার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু মজার বিষয় হলো ২০১৭ সালে বর্তমান সরকার সুপ্রীম কোর্টে হলফনামা দিয়ে সেই সুপারিশের বিরোধীতা করে। অনেকেই নিশ্চয় বর্তমান সরকারের এই বিরোধীতার সাথে সহমত পোষন করবেন। যাঁদের মতে, এই আইন তৈরী হলে বহু ক্ষেত্রেই স্বামীদের হেনস্থা করার জন্য এই আইনকেই হাতিয়ার করে তুলতে পারে অবলা বধুরা। ঠিকই তো, ভারতবর্ষের আবহমান ঐতিহ্যের ইতিহাসে কত পুরুষই না আপন স্ত্রী’র হাতে দিনরাত নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। না, ইতিহাস নিয়ে টানাটানি করার দরকার কি। ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকদল যেভাবে মনুসংহিতার আদলে সমাজ চালাতে উঠে পড়ে লেগেছে, তাতে তাদের তৈরী সরকার যে বৈবাহিক ধর্ষণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে স্বীকার করার পক্ষপাতি হবে না, সেকথা বুঝতে দুই সেকেণ্ড সময় লাগার কথা নয়। সেই কারণেই বর্তমান সরকারকে সর্বোচ্চ আদালতে হলফনাম দিতে হয়েছে। একথাও হয়তো ঠিক, বৈবাহিক ধর্ষণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হলে দেশের বর্তমান লোকসভায় নানান ফৌজদারী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত নির্বাচিত সাংসদদের শতকরা হিসাব বর্তমানের ৪২% থেকে একলাফে কত শতাংশে বৃদ্ধি পেয়ে যেতো, খোদায় মালুম।

দেশটা যতক্ষণ ভারতবর্ষ। ততক্ষণ বৈবাহিক ধর্ষণে আইনের ছাড় অর্থাৎ বাজারের ভাষায় ডিসকাউন্ট থাকবে। এ আর বেশি কথা কি। স্বামী দিনরাত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে স্ত্রী’র ভাত কাপড়ের ভার নেবে। আর রাত নিশুতি হলে স্ত্রী’র শরীর নিয়ে টানাটানি করলেই স্ত্রী’র ইচ্ছে অনিচ্ছার উপরে নির্ভর করে বসে থাকতে হবে। মামার বাড়ির আব্দার আর কি। ভারতবর্ষের আবহমান ঐতিহ্য কি বলে? ঘরে ঘরে স্বামী স্ত্রী’র যৌন মিলন কত শতাংশ স্বামীর ইচ্ছাধীন আর কত শতাংশ স্ত্রী’র ইচ্ছাধীন? আছে কোন পরিসংখ্যান? পরিসংখ্যানের ইতিহাস নাই ঠিকই। কিন্তু আবহমান সমাজবাস্তবতার ইতিহাস বহন করে চলেছে ভারতীয় নারী। পিতৃগৃহ থেকেই যাদের ব্রেনওয়াশ করে দেওয়া হয়। শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে মানিয়ে গুছিয়ে চলার শিক্ষা দিয়ে। সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে। সেটাই মানিয়ে নেওয়ার সহ্যশক্তি। মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতায় ভারতীয় রমণীকুল যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন সেকথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে নিশুতি রাতই হোক আর ভর দুপুরই হোক। স্বামী তার আপন স্ত্রীকে যৌন মিলনে বাধ্য করতে পারে বইকি। অন্তত যতক্ষণ না সেটি আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কথা হলো। আপনি কি ভাবছেন? আপনি অর্থাৎ ভারতীয় রমণীকুল। আপনার ইচ্ছে অনিচ্ছার কতটা তোয়াক্কা করেন আপনার পতিদেবতা? করলে তো আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ আপনার হাতেই। কিন্তু না করলে? তখন কি নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করবেন? না’কি আইনের পথে বিবাহ বিচ্ছেদের পথে হাঁটবেন? খাবেন কি তারপরে বাকি জীবন? সন্তান থাকলে? সমাধান কোন পথে? না’কি রাত নিশুতিই হোক আর ভর দুপুরই হোক। স্বামীর ডাকে বিছানাই ভারতীয় নারীর আত্মরক্ষার আসল কবচ?

আবার একটু অন্যদিক দিয়েও যদি উঁকি দেওয়া যায়। অধিকাংশ স্ত্রী’ই কি তাঁর দেহের উপরে স্বামীর দখলদারিত্ব ফলানোকেই ভালোবাসার প্রমাণ বলে মনে করেন না? এবং যদি কোন স্বামী সেই দখলদারিত্ব ফলানোর বিষয়ে নীতিগত কারণে বিশেষ উৎসাহী না হন। আপন ভাগ্যকেও দোষারোপ করেন না কি ভারতীয় নারীকুল? ভারতবর্ষের সমাজ। তার শত শত বছরের হাজার হাজার বছরের আবহমান ঐতিহ্য নিয়ে আজকেও যে জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেখানে স্ত্রী নিজেই যদি নিজেকে স্বামীর সম্পত্তি বলে মনে করতে থাকে। কি করে পাল্টাবে তবে দিন? আর কি করেই বা আইন প্রণয়ন হবে? বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে? পুরুষ নিশ্চয় সহজেই তার ভোগদখলের অধিকার ছেড়ে দিতে চাইবে না। কিন্তু নারী নিজেই কি সেই বিষয়টি নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে কোনদিন? আমাদের সমাজ বাস্তবতায়? ব্যক্তিগত ভাবে বিভিন্ন সময়ে বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার কথা বলছি না। স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে জীবন রক্ষার তাগিয়ে বাঁচার শেষ প্রয়াসে আইনের দারস্থ হওয়ার কথাও বলছি না। সেসব তো ঘটতেই থাকবে। প্রশ্নটা অন্যখানে। কি ভাবছে ভারতীয় রমণীকুল। বৈবাহিক ধর্ষণ দণ্ডনীয় অপরাধ? না’কি ভারতবর্ষের আদালতের রায়ের মতো অপরাধ বলে বিবেচিত হলেও দণ্ডনীয় নয়? ভারতবর্ষের পুরুষ সমাজ কি ভাবছে। সেটি তত বড়ো বিষয় নয়। যতটা বড়ো বিষয় ভারতীয় নারী সমাজ বিষয়টি নিয়ে কতদূর পর্য্যন্ত ভাবতে রাজি। অন্তত এই একুশ শতকের তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে। না, শুধুই শহুরে উচ্চশিক্ষিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্বনির্ভর নারীদের কথাই শুধু শুনলে হবে না। শুনতে হবে আপামর ভারতীয় নারীদের কথা। এবং বিশেষ করে যাঁদের ভাত কাপড়ের ভার সেই সব স্বামীদের হাতেই ন্যস্ত। যাদের হুকুমে এক দৌড়ে ছুটতে বাধ্য হতে হয় একজন নারীকে আত্মরক্ষার সেই শেষ রক্ষা কবচ বেডরুমের বিছানায়। কি ভাবে ভাবতে চাইছেন সেই মানুষটি? নারী হিসেবে নয়। স্ত্রী হিসেবে নয়। স্বামীর সন্তানদের জননী হিসেবেও নয়। একজন পূর্ণ মানুষ হিসাবে। মানুষের মৌলিক ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারে।

৩রা জানুয়ারী’ ২০২২

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s