কৃষক আন্দোলনের ৩৬৫ দিন

আজ বর্ষশেষ। বছরের শেষতম দিন। না আন্তর্জাতিক ক্যালেণ্ডারের হিসেবে নয়। নয় আমাদের বঙ্গাব্দের হিসেবেও। এই হিসেব কৃষকাব্দের। ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের আজ তিনশো পঁয়ষট্টিতম দিবস। একটানা ৩৬৫ দিন ভারতীয় কৃষক দিল্লীর সীমানায় রাজপথে বসে রয়েছে। অবস্থান আন্দোলনে। সৌজন্যে সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকার। কৃষক আন্দোলনের প্রধানতম ট্র্যাজেডি এইখানেই। যে কৃষকরা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বে গণতান্ত্রিক অধিকারে দেশের সরকার নির্বাচিত করেছিল। সেই সরকারের প্রণীত কৃষক স্বার্থ বিরোধী তিন আইন রদের দাবিতেই কৃষকদের এই আন্দোলন। হ্যাঁ এটা ঠিক, সরকার প্রধান মাত্র সাত দিন আগেই কৃষক স্বার্থ বিরোধী সেই আইন বাতিলের কথা ঘোষণা করেছেন। সেই ঘোষণাই কিন্তু যথেষ্ঠ নয়। সংসদে পাশ হওয়া আইন যতক্ষণ না অব্দি সেই সংসদেই সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বাতিল হচ্ছে। ততক্ষণ কোন ঘোষণাই যথেষ্ঠ নয়। অবশ্যই কৃষকরাও আশাবাদী সরকার সংসদীয় পদ্ধতিতেই তিন আইন বাতিল করবেন। কিন্তু কৃষকদের দাবি তাদের আন্দোলন শেষ হবে তখনই। যখন সরকার কৃষি পণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের উপরে সঠিক আইন প্রণয়ন করবে। যে আইনের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষককে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে যারা প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। অর্থাৎ যাদের কৃষি জমির পরিমান যথেষ্ঠই কম। ফসলের ন্যূনতম মূল্য না পেয়ে দেনার দায় মাথায় নিয়ে লোকসানের ভারে নুয়ে পড়ে যাঁরা আত্মহননের পথ নির্বাচনে বাধ্য হন। সারা দেশের সকল কৃষকের জন্যেই উৎপাদিত ফসলের উপরে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্য পাওয়ার অধিকার থাকা জরুরী। সরকার কর্তৃক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণই যথেষ্ঠ নয়। সেই মূল্যের নীচে ফসল ক্রয় দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেই গণ্য হওয়া উচিত। আমাদের মতো শহরের ইট কাঠ পাথরে বাস করা অনেকেরই মনে হতে পারে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের নীচে ফসল ক্রয় করা যদি অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। তবে তা বিক্রয় করাই বা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে না কেন? আর ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষককেই বা কে মাথার দিব্বি দিয়েছে লোকসানে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করার? আসলে চব্বিশ ঘন্টা মিডিয় নিয়ন্ত্রীত ভাবধারার চর্চা করতে করতে আমাদের খেয়ালই থাকে না, কৃষকের উৎপাদিত শস্য আসলেই পচনযোগ্য পণ্য। সময় মতো বিক্রী না করতে পারলে তা নষ্ট হয়ে যায়। যে কারণে মাথায় দেনার দায় আর লোকসানের বোঝা নিয়েও কৃষককে বাধ্য হতে হয় উৎপাদন মূল্যের কমে এবং সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের থেকে অনেক কমেই উৎপাদিত শস্য বিক্রী করে দিতে। আর এই কারণেই মাঠে ফসলের দাম আর বাজারে উপভোক্তার কাছে ফসলের দামের ভিতরে আকাশ পাতাল পার্থক্য। যার মুনাফা ঘরে তুলে নেয় ব্যবসাদার গোষ্ঠী। অর্থাৎ সরকার কর্তৃক ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইন না করার পিছনে এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠী গুলির স্বার্থ জড়িত। মনে রাখতে হবে, সরকারে পৌঁছানো এবং পৌঁছানোর জন্য লড়াইতে থাকা রাজনৈতিক দলগুলির দলীয় তহবিল স্ফীত করে এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলিই। ফলে সেই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করাই যেকোন শাসকদলের প্রধান লক্ষ্য ও কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক এবং সাধারণ জনতা। যাদেরকে বাজার থেকে খাদ্য ক্রয় করতে হয়। বাজারের দখল কিন্তু এই দুই গোষ্ঠীর কারুরই নয়। সেই মালিকানা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির। যাদের স্বার্থরক্ষায় প্রায় প্রতিটি নির্বাচিত সরকারই অতন্দ্র চৌকিদারিত্ব চালিয়ে যায়। না, এই চৌকিদারিত্ব ব্যক্তিগত ভাবে কোন বিশেষ ব্যক্তির পেটেন্ট করাও নয়। এই কারণেই বলা হয়। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ।

না, আমরা যারা শহর নগরবাসী। যাদের জ্ঞানবুদ্ধি বিবেক সবটাই মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত। তাদের পক্ষে এতসব খুঁটিনাটি বোঝার মত সময় ও ইচ্ছাই বা কোথায়। আমরা তো তাই জেনেছিলাম। দিল্লীর সীমানায় কৃষকরা নাই। তারা আছে সরকারের পাশে। কাজ করছে খেতে খামারে। আমরা তাই বিশ্বাস করেছিলাম, দিল্লীর সীমানায় কৃষকদের নামে আসলে ফড়েরাই ধর্ণায় বসেছে। নতুন তিন কৃষি আইনে যাদের সাম্রাজ্য খতম হবে। আর তাহলেই কৃষকরা বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সাথে চুক্তির ভিত্তিতে চাষাবাদ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যাবে। যার ফলে ফসলের আগাম মূল্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারবে। চুক্তি চাষের সুবিধায় বৃহৎ বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সরবরাহ করা উন্নতমানের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের গুণমান বাড়িয়ে তুলতে পারবে সহজেই। সরকার নিয়ন্ত্রীত মিডিয়া থেকে শুরু করে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রীত মিডিয়া তেমন ভাবেই গত এক বছর ধরে আমাদের মগজ ধোলাই করে গিয়েছে। ফলে আমরাও জানতাম দিল্লীর সীমানায় চলমান কৃষক আন্দোলনের পিছনে রয়েছে খালিস্তানপন্থী পাকিস্তানপন্থী চীনপন্থী দেশদ্রোহীরা। বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার আমদানী চলছে দেশের সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্যেই। ফলে গত একবছর ধরে চলমান এই কৃষক আন্দোলনকে আমরাও দেশবিরোধী সরকার বিরোধী চক্রান্তের এক বিরাট ষড়যন্ত্র বলেই বিশ্বাস করে এসেছি। তাই আমরা আর ফিরে তাকাইনি। কিভাবে দিল্লীর শীতে গরমে বর্ষায় ও তুফানে কৃষকরা একটানা চালিয়ে যাচ্ছে এই আন্দোলন। কিভাবে কেটেছে তাদের বিগত ৩৬৫ দিন। আমরা ফিরেও তাকাইনি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহৎ গণআন্দোলনের দিকে। আমরা আদৌ জানার চেষ্টা করিনি। কি বলছে সাধারণ কৃষকরা? কোন শক্তিতে তারা এমন বাহান্ন ইঞ্চী ছাতির দোর্দণ্ড প্রতাপ সরকারকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করলো দেশবাসীর কাছে? কিসের ভরসায় তাঁরা দিনের পর দিন রাতের পর রাত শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় পিচরাস্তায় পড়ে থাকলো? নিজ গৃহের আরাম ত্যাগ করে শত শত মাইল দূরের রাস্তায়? আমরা বোঝবারও কোনরকম চেষ্টা করিনি কিভাবে এই লক্ষ লক্ষ কৃষক জাতি বর্ণ ধর্ম নির্বিশেষে এক্কাট্টা হয়ে উঠলো? কোথায় তাঁদের প্রত্যয়ের ভিত। আর কোথায় তাঁদের আত্মনির্ভরতার নোঙর। না আমরা সেকথা অনুধাবনের কো‌ন চেষ্টাই করিনি। আমরা জানতেও চাইনি কৃষকদের আত্মশক্তির স্বরূপ। মিডিয়ার মগজধোলাই যন্ত্রেই আমরা আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক বন্ধক রেখে নিশ্চিন্তে বসে রয়েছি। আর ভোটের সময় এলেই সেই অজুহাতে ভোট দিয়েছি। যার ফল ফলেছে হাতে নাতে। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে কৃষক বিরোধী আইন প্রণয়নকারী রাজনৈতিক দলের প্রতি এই রাজ্যের জনসমর্থন এক লাফে ২০১৬ থেকে ২৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮% হয়ে গিয়েছে।

ফলে আজকে চলমান কৃষক আন্দোলনের ৩৬৫তম দিনে এসেও আমাদের যে কোন বোধদয় হয়েছে। না, তেমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। আমরা আজও মনে করি। কৃষক মাত্রেই দরিদ্র থাকবে। কৃষক মাত্রেই অশিক্ষিত থাকবে। কৃষক মাত্রেই আপন ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা রাখবে না। কৃষক মাত্রেই আমাদের মতো শিক্ষিত ভদ্রসমাজের কাছে হাতজোড় করে অনুগত থাকবে। আর আমরা কৃষকদের উপরে যখন যে আইনই চাপিয়ে দিই না কেন। কৃষক প্রভুভক্ত ভৃত্যের মতোন সেই আইন মাথা পেতে মেনে নেবে। আর না নিলেই মিডিয়া যখন যেমন প্রচার চালাবে। আমরাও তখন তেমন বিশ্বাস করে নেব কারা কারা খালিস্তানী। কারা কারা মাওবাদী। কারা কারা পাকিস্তানপন্থী। কাদের পকেটে চীন পাকিস্তান কানাডা থেকে অর্থের যোগান আসছে। না, নতুন তিন কৃষি আইনে কোন কোন ধারা রয়েছে। আমরা পড়ে দেখিনি। আর দেখবোই বা কেন? মিডিয়াতো আমাদের জানিয়েই দিয়েছে। এমন যুগান্তকারী কৃষি আইন গোটা দেশের অর্থনীতির চেহারাই পাল্টিয়ে দেবে। মিডিয়া থেকেই না আমরা জানতে পেরে ছিলাম। এই তিন কৃষি আইনে কৃষকদের কপাল ফিরে যাবে। কিন্তু কথায় বলে সুখে থাকতে ভুতে কিলায়। তাই সেই সোনায় সোহাগা আইনও বাতিল করার দাবি নিয়ে এত জলঘোলা হলো। তাই আন্দোলনরত সেই কৃষকরা ঠিক কি বলছে। সেসব কথায় আমরা কর্ণপাতও করিনি। আমরা দেখতেও যাইনি। কৃষকরা কত ভালোভাবে তিন কৃষি আইনের সকল ণত্ব ষত্ব টের পেয়ে গিয়েছে। আমরা তাই চিন্তাও করতে পারি না। তথাকথিত সেই অশিক্ষিত কৃষকরাই সারাদেশের কৃষি অর্থনীতির বিষয়ে কত গভীর জ্ঞান রাখে। আমরা বুঝতেও পারি না। দেশের কৃষি ব্যবস্থা কৃষকদের জীবনের সাথে কতটা ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত। ফলে একজন কৃষকের বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতার কোন স্বরূপসন্ধানও করিনি আমরা কোনদিন। আমাদের কাছে তারা চিরকালই অশিক্ষিত মূর্খ রয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা যেমনটা ভাবি আর যেমনটা চাই। তেমনটাই যে হবে তারও যে কোন নিশ্চয়তা নাই। ঠিক এক বছর ধরে চলা চলমান কৃষক আন্দোলন সেটাই প্রমাণ করে দেখিয়ে দিল। না, দেশের কৃষকরা আর মূর্খ নেই। তাদেরকে আর কোন ভাবেই অশিক্ষিত বলা যাবেও না। আজকে তাঁরা নিজের অধিকার ও দায়িত্ব। কর্তব্য ও প্রাপ্য বুঝে নিতে সক্ষম। আজকে তাঁরা আর শহুরে নাগরিক শিক্ষিত সমাজের মুখাপেক্ষি হয়ে বসে নেই। তাঁরা যেমন জানে, কত ধানে কত চাল। ঠিক তেমনই জানে কিভাবে কখন নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করে নিতে হয়। চলমান এই কৃষক আন্দোলন এই সত্যকে এমন দৃঢ় ভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে দিতে পেরেছে যে, এরপরেও আমরা চোখকান বুঁজে বসে থাকলে সত্যিই লজ্জা রাখার জায়গা থাকবে না আর।

২৫শে নভেম্বর’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s