মন্ত্রীপুজো

জীবিত মন্ত্রীর নামে স্টেডিয়াম কিংবা মন্ত্রীর আদলে দুর্গা মূর্তি দুই’ই গণতন্ত্রের পক্ষে বিপদজনক। একটির সমালোচনা করেও অন্যটির সমালোচনা না করা আরো বেশি বিপদজনক। সমালোচনা বা বিরোধীতা করলে দুই ক্ষেত্রেই করা উচিত। কিন্তু গণতান্ত্রিক পরিসরে উল্টোটি ঘটলে সেটা রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই নিদর্শন। গণতন্ত্রের মুখ্য অভিমুখ যখণ গণ থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করে ক্ষমতাতন্ত্রের অভিমুখে ধাওয়া করতে থাকে। তখনই গণতন্ত্রের আসল বিপদের সূচনা। আর তখনই জীবিত মন্ত্রীর নামে স্টেডিয়াম মন্ত্রী নিজেই উদ্বোধন করেন। আশা করা যেতেই পারে। জীবিত মন্ত্রীর আদলে দেবী দুর্গার মূর্তির উদ্বোধনও মন্ত্রীর নিজের হাতেই হবে। ফলে এই অশনিসংকেতগুলি আসলেই গণতন্ত্রের মৃত্যুঘন্টা বাজাতে শুরু করে দেয়। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলি একান্তই নড়বড়ে ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে। এখানে গণতন্ত্র মানে শুধুই ভোটাধিকার। বুথে বুথে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়া। আর রাজনৈতিক দলের পতাকা বহন করা। এই দুটি কাজ করে যাওয়াতেই আমাদের বিশ্বাসে গণতন্ত্রের স্থায়ীত্ব। গণতন্ত্রকে আমরা রাজনৈতিক দলের পতাকা বহন করা আর ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ইভিএমে বোতাম টেপা’র বাইরে আর ভাবতে বা অনুভভ করতে পারি না। আর সেই অক্ষমতা থেকেই গণতন্ত্রের অভিমুখ  ক্ষমতাতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে দেয়। দলতন্ত্র বা ব্যক্তিতন্ত্রই যার বাইরের আবরণ। ফলে দলতন্ত্রের পুজো বা ব্যক্তিতন্ত্রের পুজো শুরু হয়ে যায় গণতন্ত্রের অবরুদ্ধ পরিসরে। যার পরতে পরতে আসলেই ক্ষমতাতন্ত্রের আরাধনা চলতে থাকে। আর সেই ক্ষমতাতন্ত্রের আরাধনার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই মানুষ যখন তখন যেখানে সেখানে হেনস্থার শিকার হতে পারে। ক্ষমতাতন্ত্র আর যাই হোক বিরুদ্ধাচারণকে সহ্য করতে পারে না।

আমরা ভুলে যেতে থাকি, গণতন্ত্রের পরিসরে গণে’র গুরুত্ব। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করে দিই তন্ত্রের জোরটুকুই শুধু। এই তন্ত্রের জোর যে মারাত্মক। সেটি আমরা জানি ভালোভাবেই। কিন্তু গণ’কে গৌণ করে দিয়ে তন্ত্রকে শক্তিশালী করে তোলার যে রাজনীতি। সেই রাজনীতির পাকে পাকে গোটা সমাজ ও দেশ জড়িয়ে পড়তে থাকলে। না, আর যাই হোক গণ’কে রক্ষা করা মুশকিল। ভারতবর্ষেই শুধু নয়। বস্তুত গোটা উপমহাদেশেই এই গণ’কে বাদ দিয়ে তন্ত্রকে শক্তিশালী করে তোলার রাজনীতিই সক্রিয় সর্বদা। ফলে সেই পরিসরে গণ’র পক্ষ নিয়ে রাজনীতি করতে চাইলে আক্রমণটা আসতে থাকে চারদিক থেকেই। অবশ্য তন্ত্রের পক্ষ নিয়ে রাজনীতি করতে চাইলে কোন অসুবিধে নাই। ফলে যে কোন নতুন রাজনৈতিক শিবিরের জন্ম গণ’কে ছেড়ে তন্ত্রকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য সাধনেই ঘটে থকে। এও এক রাজনৈতিক পরম্পরা। কিন্তু তার ভিতরেও একটি বৈশিষ্ট বর্তমান। সময়ের সাথে গণ’কে ছেড়ে তন্ত্রের উপরে নির্ভরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর তারই সিমটমগুলি দেখা দিতে থাকে দিনে দিনে। কেউ তার নিজের নামেই আস্ত একটা স্টেডিয়ামের উদ্বোধন করছে তো কারুর আদলে দেবী দুর্গার মূর্তিই তৈরী হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতানেত্রীর জনপ্রিয়তা’র অজুহাত দেখিয়ে এই সিমটমগুলির নানাবিধ ব্যাখ্যা যতই দেওয়া যাক না কেন। কোনভাবেই আসল রোগকে আড়াল করে রাখা সম্ভব নয়। আর একবার যে রোগ ক্যানসারের মতো দ্রুতবেগে ছড়াতে শুরু করে দেয়। তাকে ঠেকানোরও আর কোন উপায় থাকে না। নেতা মন্ত্রীর নামে বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প গ্রহণও এই সিমটমগুলির ভিতরেই পড়ে যায়। জনতার কাছে নেতা মন্ত্রীদের উপস্থিত করা হতে থাকে প্রায় রাজা কিংবা রাণীর মতো। যেন জনতা, নেতা মন্ত্রীদের দয়া এবং দাক্ষিণ্যের মুখাপেক্ষী। এবং একবার সেই দয়া কিংবা দাক্ষিণ্যের অধিকারী হতে পারলেই জনতা কৃতার্থ হয়ে যায়।

গণ’কে ছেড়ে তন্ত্রের আধিপত্যের এই এক নমুনা। গণতন্ত্রের আবরণে ক্ষমতাতন্ত্র যখন এইভাবে কাজ করতে শুরু করে। তখনই স্টেডিয়ামের নামকরণে জীবিত মন্ত্রী’র নাম লাগে। দেবী দুর্গার মূর্তিতে মন্ত্রীর আদল লাগে। জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের নামেও মন্ত্রীদের নিয়ে টানাটানি পড়ে। আর জনতা পিছনে পিছনে জনসমর্থনে উর্ধবাহু হয়ে দৌড়াতে থাকে। ভোটের অংকে ও হিসাব নিকাশে এই সব বিষয়গুলির প্রতিটিই একের থেকে অপরে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠার চেষ্ট করতে থাকে। ক্ষমতাতন্ত্রের আড়ংধোলাইয়ে জনতার স্বাধীন চিন্তাশক্তির নিরন্তর ধোলাই কর্ম চলতে থাকে। ইনটারনেটের মতো এমন সর্বগ্রাসী ও সর্বশক্তিমান একটি মাধ্যম থাকতে আড়ংধোলাই কর্ম নিয়ে ক্ষমতাতন্ত্রের আর চিন্তা কি? ফলে স্টেডিয়াম উদ্বোধনই হোক আর দেবীমূর্তির উন্মোচনই হোক। জনতার ভিড়ের কোন অভাব হয় না। ভিড় আর ভোট যাতে সমার্থক থাকে সেই বিষয়েও চলতে থাকে অতন্দ্র প্রহরার বন্দোবস্ত। আর এই সব কিছুই মিলিয়ে যে এক বিপুল সিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে। তাকেই যখন গণতন্ত্র বলে চালানো হতে থাকে ভোটের পর ভোট। আর যুগের পর যুগ। তখন তন্ত্রের তলায় গণ যে চাপা পড়ে যাবে, এবং চাপা পড়েই থাকবে সে নিয়ে আর বিতর্কই বা কোথায় আর সন্দেহই বা কি?

৭ই সেপটেম্বর’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s