দলবদলের পালায় নিহত গণতন্ত্র

রাজনৈতিক দলবদলের পালা চলতেই থাকবে। যখন যেখানে মধুভাণ্ড। তখন নেতা থেকে নেত্রী সেখানে সুইচ ওভার করবে। অনেকটা মিউচ্যুয়াল ফাণ্ডের ইনভেস্টারদের মতো। নির্বাচনের আগে এবং পরে। সময় ও সুযোগ বুঝে। দর কষাকষি করে। কখনো সখনো বা সিবিআই কিংবা ইডি’র জুজু দেখেও দল বদল চলতে থাকবে। ফুটবলের দল বদলের মতো রাজনীতির দলবদলেও অর্থের একটা ভুমিকা থাকে। তবে ফুটবলের মতো ঢাক পিটিয়ে নয়। একেবারেই চোখে চোখে ইশারায়। এখন দেশে একটা সংবিধান রয়েছে। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে দলবদলের যে পালা। সেই পালা সংবিধানের ফাঁক এবং ফোঁকর দিয়ে মঞ্চস্থ হতে থাকে। এবং থাকবেই। কোন রাজনৈতিক দলই সংবিধান সংশোধনের পথে এগোবে না। সব দলই দল বদলে শক্তিহীন হলে বিপক্ষ দলের মুণ্ডুপাত করতে থাকবে। দলত্যাগী সাংসদ বিধায়কদের নৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু ভুলেও সংবিধান সংশোধনীর পথে হাঁটবে না। এক দলের প্রতীকে নির্বাচিত সাংসদ বিধায়ক কাউন্সিলর পঞ্চায়েত সদস্য দলবদল করতেই পারে। কিন্তু দলবদলের মুহুর্তেই সাংবিধানিক বিধিতে তার নির্বাচিত আসনে পুনর্নিবাচনের বিধি থাকলেই আর কোন অসুবিধা ছিল না। থাকার কথাও নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কোন বিশেষ দলের প্রার্থী হিসাবে যখন ভোটে জিতে সাংসদ বিধায়ক কাউন্সিলর পঞ্চায়েত সদস্য হন, তখন প্রাপ্ত ভোটের প্রতি তার প্রধান দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। তিনি দলবদল করা মানেই তার প্রাপ্ত ভোটের ভোটারদেরও সমর্থন তার সাথেই নতুন দলে ট্রান্সফার হয়ে যাওয়া নয়। ভোটাররা কিন্তু শুধু তাঁকেই ভোট দেয় না। সেই সাথে তিনি যে দলের প্রার্থী সেই দলকেও ভোট দেয়। এটাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি। ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তার আসন নিয়েই দলবদল করলে সেটা সরাসরি ভোটারদের সাথেই তঞ্চকতা করা হয়। এবং গণতন্ত্রেরই কণ্ঠরোধ করা হয়। সর্বপরি অপমানিত হয় দেশের সংবিধান। সেই সংবিধানকেই ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখে দেশজুড়ে এই দলবদলের রাজনীতি চলে আসছে। চলতে থাকবে।

নির্বাচনের আগে দলবদলের সাথে নির্বাচনের পরের দলবদলের ভিতর পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনের আগে দলদবল হলে জনগণ তাদের সমর্থন কিংবা বিরোধীতা ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত করতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের পরে দলবদল ঘটলে জনগণের হাতে সেই সুযোগটা আর থাকে না। ফলে এক দলের প্রতীকে নির্বাচন জিতে অন্য দলে সুইচ ওভার করা মানেই ভোটার সংবিধান ও গণতন্ত্রকেই অবজ্ঞা করা। কিন্তু সংবিধানে এই বিষয়ে কড়া কোন বিধি না থাকায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই কম বেশি এর সুযোগ নিয়ে একেবারেই অনৈতিক ভাবে সময় ও সুযোগে নির্বাচনে হেরে গিয়েও সরকার গঠন করে ফেলতে পারে। এবং করে ও করছেও। আর পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে সাংসদ পর্য্যন্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে কেনাবেচার হাটে তুলে দিয়ে বেশ কিছু কামিয়ে নিতে পারে। ফলে একবার যে কোন দলের প্রতীকেই হোক না কেন নির্বাচনে জয়ী হলেই দলবদলের হাটে দর বেড়ে যায় অনেকটাই। তবে জনতাকে ভোটার বানিয়ে এই ভাবে দলবদল করে বেকুব বানানোর খেলায় কোন জনপ্রতিনিধিই লজ্জিত হন না। উল্টে জনতার দিকে হাত নেড়ে হাসি মুখ বাড়িয়ে নির্লজ্জতার বহিঃপ্রকাশে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। রাজনীতি এমনই এক নির্লজ্জতার উন্মুক্ত মঞ্চ। মঞ্চের উপরে ওঠার যোগ্যতা অর্জনে এই নির্লজ্জতাই প্রাথমিক শর্ত। জনগণের কাছে ভোটারদের কাছে কোন জবাবদিহির দায় নেই। অথচ নির্বাচন আসলেই জোড় হাতে হাসি মুখে ঘাড় কাৎ করে দাঁড়ালেই হলো। মুখে দলের হয়ে দেওয়া ঝুড়ি ঝুড়ি প্রতিশ্রুতিই ভোট নিয়ে আসবে। আর নির্বাচনের পর হাওয়া বুঝে পাল তুলে দিলেই হলো। সংবিধান যখন পথরোধ করে দাঁড়াচ্ছে না। তখন আর অসুবিধে কি? অথচ সাংবিধানিক ভাবেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দলত্যাগ করা মাত্রই যদি সেই আসন পুনর্নিবাচনের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যেত, তাহলে কিন্তু জনতাকে ভোটার হিসাবে এইভাবে ঠকে যেতে হতো না। জনতা জনপ্রতিনিধি পুনর্নিবাচনের নৈতিক সুযোগ পেত। এবং সেই সুযোগে জনতার রায় দিতে পারতো। এবং দলবদলের হাটও বন্ধ হয়ে যেত। রক্ষা পেত গণতান্ত্র। সবচেয়ে বড়ো কথা নির্বাচনে কোন দল হেরে গিয়েও জনপ্রতিনিধি কিনে নিয়ে সরকার গঠনের পথে এগোতে পারতো না কোনভাবে। যেটি সম্পূর্ণ ভাবেই গণতন্ত্র বিরোধী এক প্রক্রিয়া। দেশ জুড়ে যা আকছাড় হয়ে চলেছে। এবং সবচেয়ে বড়ো দুঃখের বিষয় বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে কোন নাগরিক মঞ্চ থেকেও গণতন্ত্র বিরোধী এই দলবদলের পালার বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ গড়ে ওঠে না। কিংবা দলবদলের সাথে সাথেই সেই আসনে পুনর্নিবাচনের সাংবিধানিক বিধি তৈরী করতে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনীর দাবিতেও নাগরিকরা জোট বাঁধে না। ফলে শুধুই রাজনৈতিক দলই নয়। জনতাও তার দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রদর্শনেই বেশি ব্যস্ত। রাজনৈতিক দলগুলি সেই সুযোগেই সংবিধানের ফাঁক ও ফোঁকর দিয়ে দলবদলের পালা মঞ্চস্থ করে চলছে। এবং চলবেই।

৩১শে আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s