তালিবানী আতঙ্ক

দেশ জুড়ে সকলেরই মাথা ব্যাথার বিষয় হয়ে উঠেছে তালিবানদের আফগানিস্তান দখল। প্রায় গেল গেল রব। আফগানবাসীদের সব গেল সর্বস্ব চলে গেল। নারীর শিক্ষার অধিকার চলে গেল। নারীর বাড়ীর বাইরে যাওয়ার অধিকার চলে গেল। নারী স্বাধীনতা চলে গেল। আফগান রমনীদের নিয়ে দেশজুড়ে এত মানুষের এত আবেগও জমা হয়ে ছিল? আফগানিস্তান আবার বর্বর জুগে ফিরে গেল বলে ভারতীয়দের রাতের ঘুম নষ্ট। সেখানে এখন আফগান যুবকরা সকলেই টেররিস্ট হয়ে উঠবে। ড্রাগ নিতে থাকবে। সুসাইড স্কোয়াডের সদস্য হয়ে বিশ্বজুড়ে টেররিজম ছড়াতে থাকবে। যারা জীবনেও কোনদিন আফগানিস্তানে যায় নি। যাওয়ার সাধও কোনদিন হবে না। তাদেরও আফগানিবাসীর জন্যে চোখের জল যেন বাধ মানছে না। অথচ ২০০১ সালে আমেরিকা আফগানিস্তানে বোমা বর্ষণ শুরু করলে কাউকেই তখন আফগানবাসীদের জন্য চোখের জল ফেলতে দেখা যায়নি। আফগানিস্তানে মুহুর্মুহু মিসাইল বর্ষণ আর বোমারু বিমান থেকে বোমা বর্ষণের লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে তখন মানুষের উৎসাহের অভাব ছিল না কোন। যেন সেই বোমা আর মিসাইলে যারা মারা পড়ছিল তারা সকলেই তালিবান ছিল। নয়তো আলকায়দার টেররিস্ট ছিল। সেই সময় মার্কিন বোমা বর্ষণে মানুষের আনন্দ দেখে মনে হতো আফগানিস্তানে সকলেই তালিবানী টেররিস্ট। তালিবান ছাড়া যেন কোন আফগানবসাীর অস্তিত্বই সম্ভব নয়। অর্থাৎ আফগানিস্তানে শুধু তালিবানরাই যেন থাকে। তাই মার্কিন সৈন্যদের হাতে ধ্বংসলীলা যতই তীব্র হচ্ছিল, ভারতবাসীর মনের ভিতরে তাথৈ নৃত্য ততই যেন দ্রুতলয়ে আনন্দ আর উল্লাসের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল। ফলে যেদিন মার্কিন মেরিনের হাতে কাবুলের পতন হলো। আফগানিস্তান আমেরিকার কাছে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলো। আমাদের ভারতবর্ষের ভারতীয়রা একটি দেশের পরাধীনতায় আনন্দে ডগমগ হয়ে আমেরিকার নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। বিগত কুড়ি বছর সেই আনন্দেই ভারতীরা মশগুল ছিল। যাক আফগানরা মার্কীন শক্তির পরাধীন রয়েছে। আফগানবাসীদের আর কোন চিন্তা নাই। কোন অভাব নাই। ঘরে ঘরে শিক্ষা। মুখে মুখে খাদ্য। নারীরা সব স্বাধীন হয়ে জীবন যাপন করছে। দেশজুড়ে উন্নয়নের বান ডেকেছে। আমাদের দেশবাসী সুখনিদ্রায় নিশ্চিন্ত ছিল পরম বিশ্বাসে। কিন্তু হঠাৎই সকালে উঠে তালিবানীদের হাতে কাবুলের পতনে সে সুখ নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে গেল। তাই চারিদিকেই এই গেল গেল রব। যেন প্রায় নিজের ঘরেই আগুন লেগেছে।

পড়শীর ঘরে আগুন লাগায় যাঁদের এত চিন্তা। নিজের ঘরে আগুন লাগলো কিনা, সেটা দেখার তাদের সময় কই? লকডাউনের হাত ধরে কত কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছে? সেই হিসেব অবশ্য দুইবেলা টিভি নিউজে’র অন-শো ক্লাসে শেখানো হয় না। দেশের শ্রমজীবি মানুষদের আজ ঠিক কি দশা? দিন আনা দিন খাওয়া হকার সম্প্রদায়ের মানুষজন কেমন আছে এখন? অধিকাংশ ট্রেন বন্ধ। বেশিরভাগ মানুষ ন্যূনতম চলাচলের ভিতর দিয়ে প্রায় গৃহবন্দী দশায়। সম্প্রতি হাওড়া লাইনে হকার নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। কি হবে তাদের ভবিষ্যৎ। সরকার কি তাদের ঘরে বসে খাওয়াবে। তাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর ভবিষ্যৎ কি হবে? বিগত দেড় বছর স্কুল কলেজ সব বন্ধ। কিভাবে চলছে অনলাইন ক্লাস? দেশের কত শতাংশ পড়ুয়া এই অনলাইন ক্লাসে ঢুকতে পারে? কত শতাংশের হাতে স্মার্টফোন আর ইনটারনেট সংযোগ রয়েছে? ভারতবর্ষে ইনটারনেট পরিসেবার মূল্য কতো? প্রতিটি পড়ুযার সেই মূল্য দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে তো? কলকারখানার সংখ্যা গত এক দশকে কত বেড়েছে আর কত কমেছে? জানি আমরা? বিগত সাত দশকে ভারতজুড়ে নতুন কয়টি শিল্পস্থাপন হয়েছে? বেসরকারী অর্থলগ্নীর হাত ধরে কত শতাংশ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয়েছে দেশে? আর সরকারী বিলগ্নীকরণের হাত ধরে কতশতাংশ সরকারী কর্মী’র আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে? কাজ হারিয়ে দেশের বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কত কোটি? এই সাত বছরে? একটি দল, সরকারী ক্ষমতায় বসে দেশের সব সংস্থা জলের দরে বেচে দিচ্ছে। জনগণের অর্থে গোড়ে তোলা সম্পদ সব দুই একজন কোটিপতির পকেটে ঢুকে যাচ্ছে। যার ফলে গোটা দেশ আজ ভিখারী হয়ে যেতে বসেছে। না এসব নিয়ে ভাবনার সময় কোথায় আমাদের। আমরা নিজামুদ্দিনের করোনা ছড়ানো নিয়ে ভাববো। আমরা তিনমাস ধরে সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা নিয়ে ভাববো। আমরা রাম মন্দিরের শিলান্যাস নিয়ে নাচবো। আমরা কোন ভোটে কোন দল জিতবে তাই নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। আমরা পোশাক দেখে মানু্ষ চেনার কাজে আরও বেশি সময় দিতে থাকবো। আর টিভির সুইচ অন করলেই যেই তালিবানদের মুখ দেখবো। অমনি সমস্বরে তালিবান তালিবান করতে থাকবো। নারী স্বাধীনতা বিরোধী তালিবান। সন্ত্রাসবাদী তালিবান। সাম্প্রদায়িক তালিবান।

ভারতবর্ষে নারী স্বাধীনতার না’কি কোন অভাব নাই। ভারতবর্ষ বোধহয় সন্ত্রাস মুক্ত। ভারতবর্ষে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা হয়নি। ২০২০’তে দিল্লীর দাঙ্গা ঘটেনি। ভারতবর্ষের পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের বেধড়ক পিটায়নি। পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গুণ্ডাদের তাণ্ডব চালাতে সাহায্য করে নি? আর ভারতবর্ষে তো নারী মানেই জননী। তাই ভারতবর্ষেই নারীরা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার সুযোগ, উপার্জনের সুযোগ। স্বাধীন ভাবে বাঁচার সুযোগ ভারতীয় নারী ছাড়া আর কাদেরই বা রয়েছে? তাই ভারতীয়রা আজ আফগান রমনীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত চিন্তিত। কুড়ি বছর ধরে আমেরিকার হাতে পরাধীনতার নাগপাশে বন্দি থাকার সময় আফগান রমনীদের নিয়ে চিন্তার কিছু ছিল না। কিন্তু আজ তালিবানীদের হাতেই তাদের ঘোর বিপদ। এদিকে আমাদের ঘরে ঘরে নারীরা সুরক্ষিত। বাসে ট্রামে রাত বিরেতে পথেঘাটে ভারতীয় নারীদের মতো এমন নিশ্চিন্তে আর কোন দেশের নারীরাই বা চলাফেরা করতে পারে। আমাদের দেশে ঘরে ঘরে নারী শিক্ষার আলো উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে। তালিবানদের মতো আমরা নারীদের বোরখা আর হিজাবের আড়ালে মুড়ে রাখি না। আমাদের দেশের খোলামেলা আবহাওয়ায় মেয়েরাও সব খোলামেলা পোশাকে নিশ্চিন্তে বাসে ট্রামে ট্রেনে চলাফেরা করে থাকে। কারুর কোন অসুবিধাও হয় না। শ্লীলতাহানী শব্দটিই বেধহয় আফগানী শব্দ। নারী নির্যাতনের সংস্কৃতি কেবলই আফগানিস্তানের মতো ইসলামিক দেশেই সীমাবদ্ধ শুধু। আমরা তেমনটি নই। আমরা নারীকে দেবী জ্ঞানে পুজো করি না? সে’কি আর মিথ্যে হতে পারে?

সত্যিই তালিবানীদের হাতে পড়ে আফগানবাসীর কপাল পুড়লো আবার। কলকারখানা নাই। শিল্প নাই। ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ। শুধুই বন্দুকবাজি। আর আমাদের রাজ্যে? শুধুই উন্নয়নের জোয়ার। মানুষের হাতে হাতে সরকার শুধু নগদ টাকা ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কন্যাশ্রীতে টাকা। রূপশ্রীতে টাকা। সবুজসাথীতে সাইকেল। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা। বার্ধক্য ভাতায় টাকা। স্বাস্থ্যসাথী, সুডেন্টস-লোন। ধর্ষিত হলে টাকা। হাতে হাতে নগদ নগদ। সাথে রেশনে ফ্রি’তে চাল। সরকারী হাসপাতালে ফ্রি’তে চিকিৎসা। এবং দূয়ারে সরকার। রাজ্যবাসীর আর ভাবনা কি? শিল্প নাই তো কি হয়েছে? কলকারখানা বন্ধ তো কি হয়েছে? দশ বছরে শুধুই মৌ স্বাক্ষরিত হয়েছে তো কি হয়েছে? কোন শিল্পস্থাপন হয় নি তো কি হয়েছে? বরং বিনা লগ্নীতে কেমন তোলাবাজি শিল্প খুলে গিয়েছে। যুব সম্প্রদায়ের হাতে হাতে কাঁচা টাকা ঘুরছে কেমন। আর বয়স একটু বেশি যাদের। তাদেরও ভাবনা কি? সরকারে কিংবা সরকারের সাথে থাকলেই হলো। কাটমানি শিল্পেও অগাধ টাকা উড়ছে বাতাসে। শুধু ধরতে পারলেই হলো। একবার শাসকদলের পতাকা ধরতে পরলেই কাটমানি’র টাকা ধরা কোন ব্যাপার নয়। তারপর বছর বছর ত্রাণ সমাগ্রী এধার ওধার করেও আমদানী’র সুযোগও কম নয়। ফলে উন্নয়ন চলছে। উন্নয়ন চলবে। শুধু আফগানীদের জন্যেই যা চিন্তা হয়। অন্তত উন্নয়নের এই মডলেটাও যদি তালিবানীরা নকল করতে চাইতো। রাজ্যবাসীর রাতের ঘুমটা আরও একটু গভীর হতে পারতো। আফগানীরাও দুয়ারে সরকার ঘিরে ভিড় জমাতে পারতো আমাদের মতোন। সরকারই যখন দূয়ারে এসে কড়া নাড়তে থাকে। তখন জনতার আর ভাবনা কি? অর্থনীতির দশা যতই বেহাল হোক না কেন। সে’সব পরিসংখ্যানের বিষয়। নাগরিকের পকেটে নগদ টাকা ঢুকলেই হলো। দেশে চাকরি না থাক। অনুদান রয়েছে। দেশে শিল্প না থাক তোলাবাজি কাটমানি রয়েছে। দেশে তালিবান না থাক ভোট রয়েছে। সেখানে এধার ওধার একটু আধটু লাশ পড়বে। লাশ না পড়লে রাজনীতি হবে কি নিয়ে? আর রাজনীতিই না থাকলে অনুদান দেবে কে? তালিবান? তাই আফগানিস্তান তালিবানের খপ্পরে পড়ায় আমাদের দিন রাত এক হয়ে গিয়েছে দুশ্চিন্তায় আর আতঙ্কে। কি হবে সামনের ভবিষ্যৎ? না আমাদের নয়। আফগানদের।

২৫শে আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s