আফগানিস্তানে পালাবদল?

অবশেষে মার্কিন মদতপুষ্ট আফগান সরকারের পতন হয়েছে। আফগান রাষ্ট্রপতি আশরাফ ঘানি দেশ থেকে পলাতাক। একেবারে শেষ মুহুর্তের খবর, আফগান সেন্ট্রাল ব্যাংকের কোটি কোটি নগদ অর্থ সোনাদানা সহ রাষ্ট্রপ্রধান দেশ ছেড়েছেন। পলাতক রাষ্ট্রপ্রধান অবশ্য দেশছাড়ার একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন রক্তপাত বন্ধ করতেই তাঁর এই দেশত্যাগ। খবরে জানা যাচ্ছে, প্রায় বিনা প্রতিরোধে তালিবানরা কাবুল দখল করে নিয়েছে। এবং কাবুল দখলের সময়ে কোন হতাহতের সংবাদ পাওয়া যায়নি। কাবুলের জনজীবনও প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে বলেই সংবাদসূত্রের খবর। তবে সব কিছুই সময়ের সাথে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সাথে পরিবর্তন হতে পারে। আজকেই মার্কিন সময়ে অনুসারে সকালের দিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। আফগানিস্তান নিয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। বিশেষজ্ঞ মহলের আশা, আফগানিস্তানের নতুন তালিবান সরকার গঠন হলে ইরান পাকিস্তান সহ চীন ও রাশিয়াও সেই সরকারকে স্বীকৃতি দিতে পারে। অবশ্য যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোন প্রশ্নই নেই বলেই জানিয়েছেন। এই মাসের শেষেই মার্কিন বাহিনীর আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যেই সেনা সরানোর কাজ প্রায় শেষের দিকে। অবশ্য শেষ মুহুর্তে কাবুলে অবস্থানরত মার্কিন কর্মচারীদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবারো তিন চার হাজার মেরিন সৈন্য পাঠানো হয়েছে পেন্টাগন থেকে। কিন্তু তার ভিতরেই ১৬ই আগস্ট তালিবানদের কাবুল দখল বিশেষ তাৎপর্যের। এবং বিশেষ করে এই রকম সম্পূর্ণ প্রতিরোধ বিহীন ভাবে আফগান প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসের দখল নেওয়া যথেষ্ঠ তাৎপর্যপূর্ণ। বিনা রক্তপাতে তালিবানীদের হাতে কাবুলের আত্মসমর্পণ খুবই অপ্রত্যাশিত ব্যপার। বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পাশ্চাত্য সংবাদ মাধ্যম যেভাবে তালিবানীদের আক্রমণের বর্ণনা প্রচার করে আসছিল, তাতে করে তালিবানীদের হাতে সাধারণ আফগানবাসী থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের সৈন্য সামন্তদের প্রভুত প্রাণহানীর আশংকা ছড়িয়েছিল সকলের মনে। সংবাদ মাধ্যমসূত্রে আবার এও জানা যাচ্ছে, আফগান সৈন্যদের একটা বড় অংশই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তালিবানদের হাতে অস্ত্রসম্ভার তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে। তার কারণ স্বরূপ শোনা যাচ্ছে এই সৈন্যদের একটা বড়ো অংশের মাসিক বেতন নাকি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ ছিল। সেই বরাদ্দ অর্থ আফগান রাষ্ট্রপতির নিজের পকেটেই নাকি গিয়ে পৌঁছাতো। সাংবাদিকরা এও জানাচ্ছেন মার্কিন মদতপুষ্ট আফগান সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছিল। ফলে সাধারণ জনগণের একটা বড়ো অংশই সরকার পতনে উল্লসিত। এবং যেভাবে প্রায় বিনা রক্তপাত হানাহানিতে কাবুলের দখল নিয়ে নিল তালিবানীরা, তাতে এটা স্পষ্ট যে কাবুলবাসীর সমর্থন তালিবানীদের উপরেই রয়েছে। ফলে দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে কাবুল আবার তালিবানীদের হাতে।

গত দুই দশকে কত লক্ষ লক্ষ আফগানিস্তানী জনগণের বেঘোরে প্রাণ গিয়েছে? তার দায় কার? কুড়ি বছর আগে গোটা বিশ্বকে বোকা বানিয়ে রেখে আফগানিস্তানের দখল নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের যুক্তি ছিল আফগানিস্তানীদের জীবনে গণতন্ত্রের সুবিধে নিশ্চিত করতেই তাদের আফগানিস্তান দখল। আফগানবাসীকে তালিবানীদের কব্জা থেকে উদ্ধার করে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উপহার দিতেই তারা আফগানিস্তানের দখল নিচ্ছে। এবং বিশ্ববাসী তাতেই নৃত্য করতে করতে মার্কিনসৈন্যদের বিশ্বের ত্রাতার ভুমিকায় বরণ করে নিয়েছিল। পাশ্চাত্য মিডিয়ার নিরন্তর প্রচারে তালিবানীদের নৃশংসতার গল্প লোকমুখে প্রচারিত হতে হতে তালিবান আর নৃশংসতা সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গুয়ান্তেমানা বে’তে মার্কিন সংবিধানের আওতার বাইরে বন্দী তালিবানী সৈন্যদেরকে ধরে নিয়ে এসে তাদের উপরে কি ধরণের আদর যত্ন করা হতো। সেই বিষয় পাশ্চাত্য মিডিয়ার নিরবতা দেখার মতো ছিল। বিশ্ববাসীর অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে নি। কিন্তু নৃশংসতা আর তালিবান সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। এখন কয়েকটি প্রশ্ন বরং দেখে নেওয়া যাক। গত দুই দশক আমেরিকার মতো দর্দোণ্ডপ্রতাপ শক্তি যে দেশে রাজত্ব করলো। সেই আফগানিস্তানে এই দুই দশকে তলিবানদের তো সমূলে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অন্তত সেই রকমই ঘোষণা ছিল মার্কিন শক্তির। আফগানিস্তানের মাটিকে তালিবান মুক্ত করে সেখানে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা। গত দুই দশকে গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা হয়নি। হলে সেদেশের রাষ্ট্র প্রধান দেশের ব্যাংক থেকে সরকারী অর্থ লুঠ করে দেশ ছেড়ে পালাতো না নিশ্চয়। তালিবানরাও সমূলে ধ্বংস হয়নি। উল্টে ঝাড়েবংশে বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রুতগতিতে। তাহলে দুই দশকে আমেরিকা কথিত সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলো না কেন? কার স্বার্থে? আর তালিবানরা ধ্বংস হলো না কেন, কাদের পৃষ্ঠপোষকতায়? না, আফগানিস্তানের মাটিতে মার্কিন সৈন্য ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকলো দুই দশক। আর পাকিস্তান কিংবা ইরানের মদতে সেই দেশে তলিবানদের এমন বাড়বাড়ন্ত হলো যে, মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতিতেই কাবুল দখল হয়ে গেল বিনা রক্তপাতে? এসব গালগল্প পাশ্চাত্য মিডিয়ায় চলতে পারে। রাজনীতির ইতিহাসে অচল। এবার আসা যাক পরের প্রশ্নে। আফগানিস্তানের সাধারণ জনতার সমর্থন ছাড়া তালিবানরা এমন ব্যাপক ভাবে সমাজের ভিতরে প্রভাব বিস্তার করতে পারতো কি? খুব সাধারণ বুদ্ধিতেও যদি প্রশ্ন করা যায়। উত্তর পাওয়া কি খুব কঠিন? তাহলে আফগানবাসীর ভিতরে তালিবানদের প্রতি জনসমর্থনে নিশ্চয় অভাব নেই। অভাব থাকলে দুই দশকের মার্কিন রাজত্বে তালিবানী সংস্কৃতির অবসান হয়ে যাওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে ঠিক তার উল্টো। অর্থাৎ আমেরিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গল্পকে আফগান জনতা কোনদিনই বিশ্বাস করে ছিলনা। এবং মার্কিন শক্তির তালিবানদের নাশ করার গল্পও আফগানিস্তানে চলেনি। ফলে অবধারিত ভাবেই পরের যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায়। সেটি হলো। মার্কিন শক্তি তালিবানদের সমূলে বিনাশ করলো না কেন? এখানে ভিয়েতনামের প্রসঙ্গ নিয়ে আসলে স্বীকার করতে হয়, তাহলে তালিবানরা আফগানিস্তানের সমাজেরই প্রধানতম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এবং ভিয়েতনামের মতোই আফগানিস্তানেও মার্কিন শক্তির অন্তত নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। আফগানবাসীরা তালিবানদের হাত শক্ত করেই তালিবানদের হাত ধরেই দুই দশক সাম্রাজ্যবাদী মার্কিণ শক্তির সাথে সংগ্রাম করে গিয়েছে। ভিয়েতনামের সাধারণ জনতা যেমন কমিউনিস্টদের সাথে নিয়েই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিল। আর নয়তো গল্পের ভিতরে আরও ভিন্নতর কোন গল্প রয়ে গিয়েছে। আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে। যেখানে তালিবানদের উচ্ছেদ বা বিনাশের কোন পরিকল্পনাই মার্কিন শক্তির ছিল না। থাকলে এই একমেরু বিশ্ব বন্দোবস্তে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানের সুযোগে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলাফলে, আফগানিস্তানকে তালিবান মুক্ত করা মার্কিন মেরিনের সাধ্য ছিল না। বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। ফলে গল্পের ভিতরে কোন গল্প লুকিয়ে রয়েছে সেটি এখনো অজনা অনেকেরই।

এটা জলের মতো পরিস্কার। দুই দশকে মার্কিন শক্তি আফগানিস্তানকে আঁখের ছিবড়ে করে ছেড়ে যাচ্ছে। এবং এটাই বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেই বিদ্ধস্ত বিপর্যস্ত অফগানিস্তানের দখল কারা নিচ্ছে বা নেবে, সেটি আপাতত মার্কিন স্বার্থের কোন বিষয় নয়। বরং এটাও জলের মতোই পরিস্কার। তালিবানদের সাথে মার্কিনদের গোপন বোঝাপড়া মতোই পরিস্থিতি এগিয়ে চলেছে। অর্থাৎ মার্কিন শক্তির আফগানিস্তান ত্যাগের সাথে সাথেই তালিবানদের আফগানিস্তান দখলের স্ক্রিপ্ট পেন্টাগনেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। ফলে যা কিছু হচ্ছে। বুঝতে হবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণেই হচ্ছে। এই বিষয় অন্তত সংশয়ের কোন জায়গা নাই। বিগত তিন দশকের আফগানিস্তানের ইতিহাসের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট, তালিবান শুধু যে মার্কিনশক্তির হাতে গড়া তাই নয়। তালিবান বিগত তিন দশক ধরেই মার্কিনদের স্বার্থ রক্ষায় ওঠবোস করে গিয়েছে। তাই আজ যখন আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছে, তখন বকলমে সেই তালিবানদেরই আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসিয়ে রাখাটাও মার্কিন স্বার্থেরই অঙ্গ। কিন্তু যে মিথ্যা প্রচারে মার্কিন শক্তি আফগানিস্তানের দখল নিয়েছিল। সেই মিথ্যা প্রচার থেকে মুখ রক্ষার জন্যেই তারা আবারো গোটা বিশ্বকে এই বলে ধোঁকা দিতে চাইছে যে, আফগানিস্তানের ভাগ্য আফগানবাসীকেই ঠিক করে নিতে হবে। কাবুলকে তালিবানদের থেকে রক্ষার দায় মার্কিনরা নিতে যাবে না। আসলে যে উদ্দেশে তালিবানকে মার্কিনশক্তি ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। যে উদ্দেশে ২০০১ সালে সেই তালিবানকেই উৎখাত করে আফগানিস্তানের দখল নিয়েছিল। এবং যে উদ্দেশে ২০২১শে মার্কিন শক্তি আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই সেই তালিবানকেই বকলমে কাবুলের ক্ষমতায় আবারো বসিয়ে গেল। এই প্রতিটি উদ্দেশ্যই একটি মালার ভিন্ন ভিন্ন অংশ মাত্র। এটাই আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী স্বরূপ। দুই দশকের কাজ শেষ। এবার নতুন পর্ব শুরু। সেই নতুন পর্বেও আফগানিস্তান যাতে তালিবানীদের মাধ্যমে আমেরিকার স্বার্থেই পরিচালিত হতে থাকে। পেন্টাগন থেকে সেই বন্দোবস্তই নেওয়া হয়েছে্। নাহলে আমেরিকার সৈন্য অপসারণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এত তাড়াহুড়ো করে তালিবানদেরকে কাবুলের মসনদে বসিয়ে যাওয়ার দরকার হতে না। তালিবানরা ছাড়া আফগানিস্তানে আমেরিকার এমন বিশ্বস্ত এবং শক্তিশালী প্রতিনিধি কেউ নেই। এই সোজা কথাটাকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি থেকে আড়াল করতেই মার্কিনশক্তির তালিবান বিরোধী সেজে থাকা। সেই নাটকে তারা একশো শতাংশ সফল। কারণ আমরা কেউই সহজ প্রশ্নগুলিকে গুরুত্ব দিতে চাই না। উল্টে পাশ্চাত্য মিডিয়ার শিখিয়ে দেওয়া বুলি মুখস্থেই তোতাপাখি হয়ে ওঠায় শান্তি পাই। তাই আমাদের চোখে আমেরিকা আর তালিবান দুটি পরস্পর বিরোধী শক্তি বলে ধরা দেয়। আসলে তালিবানদের মতো এমন বিশ্বস্ত সৈনিক মার্কিন শক্তির ভাঁড়ারে কমই রয়েছে। এখন দেখার বিষয় এটাই, তালিবানদের আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অমেরিকা পরবর্তীতে কোন কোন ফসল ঘরে তুলতে থাকে।

১৬ই আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s