বৈবাহিক ধর্ষণ

কি আশ্চর্য্য! আমরা এমন একটি রাষ্ট্রের নাগরিক, যে রাষ্ট্রের আইন বৈবাহিক ধর্ষণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করে না। আমরা কি আদৌ সভ্য? এটা কি একটি সভ্য সমাজ? যে সমাজে বৈবাহিক ধর্ষণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলেই গণ্য করা হয় নয়। কি চমৎকার। হ্যাঁ এটা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। এককালে এই সমাজে দেবদাসী প্রথার চল ছিল। আজও হয়তো চলে তবে লুকিয়েচুরিয়ে। এককালে পুরুষের বহু বিবাহ প্রথারও চল ছিল। একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী। আজ সেই সব দুষ্ট রোগের আইনানুগ উপশম হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাই বলে ধর্ষণের মতো একটি মানবতা বিরোধী ভয়ঙ্কর অপরাধকে বৈবাহিক পরিসরে এমন ভাবে ছাড় দিয়ে রাখার অর্থ কি? তাহলে তো ধর্ষণের পরে অনেক ধর্ষকও ধরা পড়ে ধর্ষিতাকে বিবাহে রাজি হয়ে গিয়ে সাজা এড়িয়েও যেতে পারে? আর বিবাহ করার অর্থ কি স্ত্রীকে ধর্ষণ করার অধিকার লাভ? সমাজে বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে কোন আইন না থাকার একটাই অর্থ হয়। সমাজ বৈবাহিক ধর্ষণকে সমর্থন করে। কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটি কল্পনা করা যায়? যে রাষ্ট্রে বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে কোন আইন থাকে না। সেই রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক? যে সমাজ বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ বলে স্বীকার করে না। সেই সমাজ কতটা মানবিক? এই প্রশ্নগুলি যদি একুশ শতকেও না ওঠে, তবে আর কবে উঠবে?

স্বামীস্ত্রী’র দাম্পত্য সম্পর্কের একান্ততায় আর যাই করা যাক না কেন, কখনো‌ই কোন অবস্থাতেই ধর্ষণ করা যায় না নিজের স্ত্রীকেও। একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর অধিকারের বস্তু নন। তিনি তাঁর স্বামীর মালিকাধীন দাসও নন। তাঁর নিজস্ব স্বতন্ত্র সত্তা বিদ্যমান। তাঁর ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য রয়েছে। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, তাঁর শরীর এবং মনের উপরে তাঁর স্বামী কখনোই কোন অবস্থাতেই কর্তৃত্ব ফলাতে পারেন না। ধর্ষণের মূল বিষয়টি কি? একজন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপূর্বক তাঁর শরীর স্পর্শ করাই ধর্ষণ। সেই অপকর্ম তাঁর স্বামী করলেও সেটি ধর্ষণের নামান্তর। সমাজ বা রাষ্ট্র, রীতি বা আইন সেকথা স্বীকার করুক আর নাই করুক। নারীর শরীর ও মনের একমাত্র মালিক সেই নারী নিজে। ঠিক যেমন একজন পুরুষের শরীর ও মনের মালিকানা সেই পুরুষের। আর কারুরই নয়। ফলে স্ত্রী রূপী নারীর শরীর ও মনের নাগাল পেতেও স্বামী কখনোই কোন অবস্থাতেই স্ত্রীর উপরে শারীরীক কিংবা মানসিক কোন প্রকার বল প্রয়োগ করতে পারেন না। এটাই একটি সভ্য সমাজের রীতি। ফলে সমাজ যদি সভ্য হয়। তবে সেই সমাজ বৈবাহিক ধর্ষণকেও মানবতা বিরোধী জঘন্যতম অপরাধ বলেই স্বীকার করবে। এবং সেই অনুসারে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করবে। এমনটাই একটি সভ্য সমাজের কাছে প্রত্যাশীত।

কিন্তু না। ভারতবর্ষ একটি সুমহান ব্যতিক্রম! ভারতবর্ষের আইনে বৈবাহিক ধর্ষণ কোন অপরাধ নয়। বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে কোন আইন তৈরী করা হয় নি। করলে বহু ভারতীয় পুরুষেরই যে ঠাঁই হওয়ার কথা শ্রীঘরে। কিন্তু তাই কি আর হতে পারে? কথায় বলে ঠগ বাছতে গাঁ উজার। ফলে তখন কে কার অপরাধের বিচার করে? আমরা কথায় কথায় তালিবানী সংস্কৃতির কথা বলে থাকি। বলে বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশেষ বিশেষ দেশের লোকাচার আইন ইত্যাদির সমালোচনা করে থাকি নাক উঁচু ঐতিহ্যে। কিন্তু তখন আমাদের কারুরই খেয়াল থাকে না। নিজে যে রাষ্ট্রের নাগরিক। সেই রাষ্ট্রেই আবাহমান কাল ধরে পুরুষ বৈবাহিক অধিকারে স্ত্রী রূপী নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে দিনের পর দিন বলপূর্বক তার সাথে যৌন সংসর্গ স্থাপন করে আসছে। না, অবশ্যই সকলেই নয়। কিন্তু অনেক পুরুষই আপন স্ত্রী’র ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে তার সাথে বলপূর্বক যৌনমিলনে লিপ্ত হয়। এটাই ভারতীয় ঐতিহ্য। পিতৃতন্ত্র এই ঐতিহ্যকেই উত্তরাধিকার স্বরূপ বহন করে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। আমরা কিন্তু সেইসময়ে এই ঐতিহ্যকে তালিবানী সংস্কৃতি বলে সমালোচনা করি না। বড়ো জোর বলি, অমুকের স্বামী খুব অত্যাচারী। নিত্যদিন স্ত্রী’র উপরে অত্যাচার করে। কিন্তু রাষ্ট্র কেন বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ বলে স্বীকার করে না, সে অপরাধের বিষয়ে আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকি।

এটাই আমাদের প্রকৃতি। তাই আজকে একুশ শতকে পৌঁছিয়েও সমাজের ভিতর থেকে কোনদিন দাবি ওঠেনি, বৈবাহিক ধর্ষণ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করতে হবে। অনেকেই বলতে পারেন। তাহলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তাতো নয়। খুবই ঠিক কথা। অনেকেই বলবেন, সংসারের একমাত্র উপার্জনশীল পুরুষটি যদি বৈবাহিক ধর্ষণের অপরাধে শাস্তিভোগ করতে জেলে যায়। তাহলে তো গোটা সংসারটাই ভেসে যাবে। পরিবারের বাকিদের খাওয়াপড়ার দায় নেবে কে? যুক্তিযুক্ত কথা নিঃসন্দেহে। কিন্তু তাই বলে কি স্ত্রী হত্যার দায়ে কোন পুরুষের সাজা হয় না আমাদের সমাজে? স্ত্রী হত্যায় সাজাপ্রাপ্ত স্বামীরা কি জেলে যায় না? যায় নি কোনদিন? পরিবারের একমাত্র রোজগেরে শুধুমাত্র এই কারণে কোন স্বামী কি স্ত্রীকে হত্যা করেও বেকসুর খালাস পেয়েছে? না পায়? ফলে সে’টি আসল কথা নয়। আসল কথা ভারতবর্ষে প্রতিবছর যত পুরুষ স্ত্রীকে হত্যা করে, তার থেকে হাজার হাজার গুন বেশি পুরুষ আপন স্ত্রী’র ইচ্ছে অনিচ্ছের তোয়াক্কা না করে, বলপূর্বক স্ত্রীর সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হয় রাতের পর রাত। ফলে আসল সমস্যা সংখ্যা নিয়ে। বৈবাহিক ধর্ষণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে স্বীকার করলে কোটি কোটি পরিবারেই একমাত্র রোজগেরে মানুষটিকে জেলে যেতে হবে। সমাজে একটি চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। সমাজ সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি আজও। তাই বৈবাহিক ধর্ষণের মতো চরমতম অপরাধও আইন ও সমাজের প্রশ্রয় পেয়ে চলেছে আবাহমান কালব্যাপী। এই ভারতে।

৭ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s