স্কুল খোলার ঘন্টা

অবশেষে স্কুল খোলার ঘন্টা কি বাজতে চলেছে? গত বছর মার্চের প্রথমেই স্কুলগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে স্কুল কলেজের পড়ুয়ারা এক কথায় স্কুলছুট অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনলাইন ক্লাসের সুযোগ প্রাপ্ত সৌভাগ্যবানেরা মধ্যবর্তী সময়ে কতটা শিক্ষার্জন করতে পেরেছে সঠিক ভাবে বলা সম্ভব নয়। আর অনলাইন ক্লাসের আওতার বাইরে পড়ে থাকাদের পক্ষে পরবর্তী পড়াশুনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া আদৌ কতটা সম্ভব হবে বলা মুশকিল। এর ভিতরে বিনা পরীক্ষায় প্রায় সকলকে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পাশ করিয়ে দিতে হওয়ায় আরও একটা বড়ো সমস্যা সামনে। এই বিপুল পরিমাণ পাশের সার্টিফিকেট হাতে ধরা পড়ুয়ারা পরবর্তী পড়াশুনা চালিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেও তো পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা করতে পারবে না রাজ্য সরকার। সেক্ষেত্রে বহু ছাত্রছাত্রীকেই পাশের কাগজ হাতে নিয়ে বাড়িতেই বসে থাকতে হবে। ভর্তি’র সুযোগ না পেয়ে। ফলে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি প্রায় হাতের বাইরে। সেই অবস্থায় স্কুল খোলার কথা শোনা যাচ্ছে। আপাতত লক্ষ্য পুজোর ছুটির পর। একদিন অন্তর স্কুল খোলা হতে পারে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না, একদিন অন্তর খোলা আর প্রতিদিন স্কুল খোলার ভিতর ঊনিশ বিশ কি পার্থক্য থাকতে পারে। কথা হচ্ছে সকল শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের টীকাকরণ সম্পূর্ণ করেই স্কুল খোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করার। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ভিতরে সেই লক্ষ্য পুরণের সম্ভাবনাই বা কতটা। প্রশ্ন সেখানেও। যদি আরও আগে থেকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় সরকারী প্রকল্পের আওতায় সকল শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মীদের টীকারণ শুরু করা যেত। তাহলে হয়তো নিশ্চিত হওয়া যেতে পারতো, স্কুল খোলার সময়ে সকলেই টীকা নিয়ে করোনা মোকাবিলায় তৈরী। সেক্ষেত্রে অভিভাবকরাও অনেক বেশি নিশ্চিন্তে পড়ুয়াদের স্কুলে পাঠাতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে রাজ্যের টীকারণের পরিস্থিতি যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। তাতে পুজোর ছুটির ভিতরে প্রত্যেক শিক্ষক শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মী সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সহায়কদের টীকাকরণ সম্পূর্ণ হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। সরকার বড়োজোর নিয়ম করতে পারে। কেবলমাত্র যাঁদের টীকাকরণ সম্পূর্ণ, সেই সকল শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মী ও সহায়করাই স্কুলে যোগ দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রেও অধিকাংশ স্কুল কলেজেই পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মী ও শিক্ষক পাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে পঠনপাঠন স্কুল খুললেই যে রাতারাতি পুরোদমে শুরু করা যাবে, বিষয়টা আদৌ সেইরকম নয়।

অপরদিকে, কজন অভিভাবক আপন সন্তানদের নিশ্চিন্তে স্কুলে পাঠাতে পারবেন? সবসময় মনের ভিতরে আশংকা নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগা ছাড়া আর কোন পথও হয়তো থাকবে না। এর ভিতরে তথাকথিত তৃতীয় ঢেউ নিয়ে সেই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যদি এসেই পৌঁছায়। তাহলে তো স্কুল খোলার স্বপ্ন এ বছরে আর দেখতে হবে না। এর ভিতরে আবার এই কথাও ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামোয়, স্কুলের পঠনপাঠন শিক্ষার্থীদের জন্য আদৌ পর্যাপ্ত নয়। প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই প্রাইভেট কোচিং এর মাধ্যমেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। আমরা দশকের পর দশকে এই পরিস্থিতিকেই সর্বাত্মক এবং অনিবার্য্য করে তুলেছি। ফলে স্কুলে যাওয়ার অর্থ হাজিরা দেওয়ার নামান্তর। তার বেশি কিছু নয়। আসল যেটুকু লেখা পড়া শেখা, কিংবা নোট মুখস্থ করে নম্বর তোলার শক্তি সঞ্চয়। সে সবই ঐ প্রাইভেট কোচিং নির্ভর। ফলে শুধু স্কুল খুলে দিলেই হবে না। গোটা প্রাইভেট কোচিং সিস্টেম আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে কাজ শুরু না করা অব্দি, রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে না। কিন্তু তার জন্যে প্রত্যেক রাজ্যবাসীর টীকাকরণ সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। আগামী দুই বছরের ভিতরেও সেই কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে রাজ্যের শিক্ষার্থীদের অবস্থা যতটা শোচনীয়, তাদের ভবিষ্যৎ তার থেকেও অনেক বেশি ভয়াবহ। বিশেষ করে বিগত এক দশক ব্যাপী সময় সীমায় রাজ্যে ও দেশে কর্মসংস্থানের পরিকাঠামো যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তাতে শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত এবং অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এক ভয়াবহ পর্যায় গিয়ে পৌঁছাবে আর কয়েক বছরের ভিতরেই। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তো পরের বিষয়। আগে শিক্ষার পরিকাঠামোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসাই সবচেয়ে জরুরী। কিন্তু তার জন্যে চাই অনেক বেশি দক্ষতার সাথে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট পরিচালনা করা। কিন্তু আমাদের রাজ্যে সেই সম্ভবনা আদৌ কতটা রয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। এবং দুশ্চিন্তার বিষয়ও বটে।

৫ই আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s