নুসরতের গর্ভে কার সন্তান

সাংসদ ও চলচিত্র অভিনেত্রী নুসরতের গর্ভে কার সন্তান, সেই নিয়ে উত্তাল মিডিয়া ও জনতা। এবং আশ্চর্য্যের বিষয় একুশ শতকে পৌঁছিয়েও কারুরই মনে হচ্ছে না, নুসরতের গর্ভে নুসরতেরই সন্তান থাকার কথা। অন্য কারুর সন্তান হতে পারে একমাত্র তখনই নুসরত যদি সারোগেট মাদার হওয়ার বরাত নিয়ে থাকেন। না নিলে কোটি কোটি নারীর মতোই একজন নারীর গর্ভে তাঁর নিজের সন্তানই থাকার কথা। অন্য কারুর সন্তান নয় নিশ্চয়। আমরা সময়ের হিসেবে একুশ শতকে পৌঁছিয়ে গেলেও চেতনার জড়তায় এখনও মধ্যযুগীয় মানসিকতায় আটকিয়ে রয়েছি। গর্ভের মালিকানা নারীর। সেই গর্ভের ভ্রূণের জন্মদাত্রীও নারী। ফলে সেই সন্তান সেই নারীরই আপন সন্তান। তাকে রক্তে মাংসে অস্থিতে মজ্জায় তিলে তিলে গড়ে তোলার দায়িত্ব সেই মায়েরই একান্ত ভাবে। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আজ অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যের ভ্রূণ আপন গর্ভে প্রতিস্থাপিত করে ভাড়াটে মাতৃত্বের দায়ও নিয়ে থাকেন কেউ কেউ। কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। নিয়ম নয়। প্রতিদিন কোটি কোটি নারীর গর্ভে ভ্রূণের জন্ম হচ্ছে। সেই ভ্রূণজাত সন্তান নারীর গর্ভেই বড়ো হয়ে উঠছে। নারীর গর্ভে নারীর সন্তান বড়ো হয়ে উঠলেও সেই সন্তান কার বলে কোলাহল করা একেবারেই মধ্যযুগীয় মানসিকতার সংস্কৃতি। আর দুঃখের বিষয়, এটাই আমাদের সামাজিক ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী আমরা সকলেই। সন্তানের প্রাকৃতিক পরিচয়, তার মাতৃপরিচয়ের নিরূপিত হয়। সেটাই এই বিশ্ব প্রকৃতির নিয়ম। নারী তাঁর আপন শরীর দিয়ে আরও একটি শরীরের জন্ম দিচ্ছে। আর সেই শরীরের পরিচয় জানতে খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে কোন একজন পুরুষকে! কি আশ্চর্য্য এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছি আমরা। তারপরে সেই সংস্কৃতিকেই সভ্যতা বলে গর্ব বোধ করছি। প্রকৃতির দরবারে এইরকম সীমাহীন অসভ্যতা চলে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। ভাবলেও লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে।

সত্যিই লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। নুসরত একজন সাংসদ এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী বলে নয়। একজন নারী হিসেবেই কি অপরিসীম অসম্মান আমরা দেখাই। যখন কোন নারীকে প্রশ্ন করা হয়। তাঁর গর্ভে কার সন্তান জানতে চেয়ে। নুসরতের ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা আমরা ঘটিয়েছি। এবং সম্পূর্ণ বেহায়ার মতোন। গোটা মিডিয়া। গোটা সমাজ। একজন নারীর কাছে নিজেদেরকে ছোট করার এর থেকে বড়ো সুযোগও হয়তো সমাজের হয় না সহজে। আর গোটা একটা সমাজ যখন সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত নিজেকে ছোট করতে থাকে, তখন মানুষের ইতিহাসে মুখ দেখানোর স্থান থাকে না আর। আর এই ঘটনাও মানুষেরই ইতিহাস। কি নির্মম ট্র্যাজেডি। মানুষের বংশ পরিচয় যেদিন থেকে তার পিতৃপরিচয়ে স্থির হওয়া শুরু হয়েছে। সেইদিন থেকেই আমরা প্রকৃতির অভিমুখের বিপ্রতীপে এগোতে শুরু করেছি। বিশ্বপ্রকৃতির সর্বত্র, জন্মদাত্রী জননীর পরিচয়েই সকল সৃষ্টির পরিচয়। একমাত্র মানুষের সমাজে জন্মদাত্রী জননীর পরিচয় গৌন।

এই যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। এখানো নারী আসলে সন্তান উৎপাদনের একক মাত্র। বংশগতির ধারাকে বজায় রাখতে নারীর গর্ভ ছাড়া উপায় নাই। ফলে সেই গর্ভের কর্তৃত্ব নিতেই পিতৃতন্ত্রের উদ্ভব। একটি কারখানায় যেমন পণ্যের উৎপাদন হয়। নারীর গর্ভেও ঠিক তেমন সন্তান উৎপাদিত হয়। কারখানায় প্রস্তুত মালের মালিকানা যেমন থাকে কারখানার মালিকের। কারখানার শ্রমিকের নয়। ঠিক তেমনই সন্তানের পরিচয় স্থির হয় সন্তানের পিতার পরিচয়। সন্তানের জননীর পরিচয়ে নয়। এই রকম একটি অসভ্য এবং বর্বর প্রথা গোটা বিশ্বের মানব সমাজকেই খর্ব করে রেখে দিয়েছে। আর তখনই আমাদের যাবতীয় কৌতুহল গিয়ে পড়ে সেই একটি প্রশ্নেই। নুসরতের গর্ভে কার সন্তান? এই পিতৃতান্ত্রিক এবং মধ্যযুগীয় মানসিকতায় আমরা স্বচ্ছ ভাবে চিন্তা করার শক্তিও ধরি না। আমাদের যাবতীয় আগ্রহ তখন দৌড়াতে থাকে, নুসরৎ কার কার সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছে। না, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক পাতানো নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। আমাদের কাছে সম্পর্ক পাতানো মানে নারী পুরুষের সহবাস। যার একটই অভিমুখ, যৌনসংসর্গ। আর সেটিই আসলে জনতার মূল কৌতুহলের বিষয়। নুসরৎ কার কার সাথে যৌনসংসর্গে লিপ্ত। তার ভিতর কে নুসরতের সন্তানের আসল পিতা। গোটা সামাজের যাবতীয় কৌতুহল সেখানেই।

সমাজ আজও নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। সমাজ আজও নারীর প্রাপ্য সম্মানে নারীকে স্বীকার করতে রাজি নয়। বরং শরীরের খিদে মেটাতে নারীকে শিকার করতেই সমাজের অবদমিত বাসনা। নানবিধ আইনের বেড়াজালে নারীর যেটুকু রক্ষাকবচ। না হলে গোটা সমাজ আজও সেই মধ্যযুগীয় চেতনায় অবরুদ্ধ। নারী শারীরীক ভোগের সামগ্রী। পুরুষের বংশগতির ধারা বজায় রাখার নিমিত্তে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মাত্র। বাকি সব যন্ত্রের মালিকানার মতো তাই নারীর গর্ভেরও মালিকানা পুরুষের হাতে। আর সেই জন্যেই নুসরতের গর্ভে কার সন্তান ফুটলো। সেই পরিচয়ই আসল কথা। অর্থাই সেই মালিকানা। পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের মালিকানা। একটু বেআব্রু ভাবে বললে, নুসরতের গর্ভের বর্তমান মালিক কে? সেটাই সমাজ ও মিডিয়া, জনতা ও মানুষের আগ্রহের বিষয়। আমরা নারীকে স্বাধীন ভাবে মর্য্যাদা দিতেই শিখি নি। নারীকে পুরুষের ভোগের নিমিত্তে পুরুষের সন্তান উৎপাদক যন্ত্র হিসেবে পুরুষের মালিকানার অধীনস্ত ভোগ্য পণ্য হিসেবেই অনুভব করি। পুরুষ হিসেবে। প্রেমিক হিসেবে। স্বামী হিসেবে। পরিবার হিসেবে । সমাজ হিসেবে। রাষ্ট্র হিসেবে। আর সেই দেখার সংস্কৃতিকেই নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই প্রতিটি ধর্মই পিতৃতন্ত্রকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়েই ধর্ম প্রচার করে গিয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে। ফলে আমাদের সমাজের কোন নুসরতদের জন্যেই আপন গর্ভের অধিকারটুকুও স্বীকৃত নয়। সে তিনি যতই নির্বাচিত সাংসদ বা জনপ্রিয় অভিনেত্রীই হোন না কেন। আসলে তিনি আর পাঁচজন সাধারণ নারীর মতোই পিতৃতন্ত্রের মালিকানাধীন।

৪ই আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s