বেআইনী ধারার বেআইনী প্রয়োগ

কথায় বলে পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। আর যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। কথাদুটি যে কতটা সত্য। বোঝা যাচ্ছে বর্তমান ভারতে। যেভাবেই হোক কোন অভিযোগে পুলিশের খাতায় একবার নাম উঠে গেলেই হলো। দিনের পর দিন আদালতের চক্করে পড়ে থাকো। বছরের পর বছর গড়িয়ে যাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। এবং শেষমেশ স্বসম্মানে বেকসুর খালাস হলেও, দোষী পুলিশ আধিকারিকদের কোন সাজা হবে না। নির্দোষ ব্যক্তিকে অন্যায় ভাবে অভিযুক্ত করে আদালতের চক্করে ঠেলে দেওয়ার জন্য। এটা ভারতবর্ষের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলিতেই সম্ভব। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা। নিরাপরাধ মানুষের জীবনের অতি মূল্যবান সময়গুলি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুবিচার পাওয়ার লড়াইয়েই শেষ হয়ে যায়। প্রতিবছর এইভাবে কত হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ অন্যায়ের শিকার হয়ে বিনা বিচারে জেলের ঘানি টানে, তার কোন সঠিক হিসাব নেই। অথচ দোষী পুলিশ আধিকারিকদের কোন সাজা হয় না, নিরাপরাধ মানুষকে গারদের ভিতরে আটক রাখার জন্য। আর দেশের ভার যাদের হাতে। তাদের মুখে একটাই বাণী। আইন আইনের পথে চলবে। কিন্তু ভারতবর্ষের আইনের পথটা যে কি ভীষণ রকমের বাঁকা, সেটা ভুক্তোভূগী মাত্রেই জানে। এই অব্দি চিত্রটা ভারতবাসী মাত্রে সকলেই জানেন। ফলে ভারতে এই চিত্র অত্যন্ত স্বাভাবিক। এর ভিতরে কোন বিস্ময় নেই। অন্যায় যাই থাকুক আর নাই থাকুক। ক্ষমতায় থাকলে শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনে পুলিশকে ঝুড়ি ঝুড়ি অনৈতিক কাজ করতে হয়। আমরা সকলেই জানি। কিন্তু সম্প্রতি একটি ঘটনা সব রকমের অন্যায়কেই ছাপিয়ে গিয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের রায়ে সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাওয়া একটি অসাংবিধানিক সরকারী আইনকে বেআইনী ভাবে ব্যবহার করে বহু মানুষকে আদালতের চক্করে ঘোরানোর মতো দুর্নীতি চলছে দিনের পর দিন ধরে। সরকার চুপ করে বসে রয়েছে। আর শাসকদলের অঙ্গুলি হেলনে সরকারী পুলিশ এই বেআইণী কাজ করে চলেছে বছরের পর বছর।

সুপ্রীম কোর্ট ২০১৫ সালেই ভারত সরকারের তথ্য প্রযুক্তি আইনের 66A ধারাটিকে সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে রায় দান করেছিল। অন্তর্জালের দিগন্তে দেশবাসীর স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করা এই অসাংবিধানিক ধারাটিকে সুপ্রীম কোর্ট বাতিল করে দেওয়া সত্ত্বেও, আজও বহু মানুষকে এই বেআইনী ধারায় আটক করে আদালতে তোলা হয়। অবশ্যই শাসকদলের অঙ্গুলি হেলনেই। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার বিষয়। বহু আদালতেই এমন একটি বেআইনী ধারায় অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করাও চলছে অম্লানবদনে। এই হলো এদেশে ‘আইন আইনের পথে চলবে’র প্রকৃত নমুনা। আপনি অন্তর্জালে কোন স্যোশালসাইটে সরকারের সমালোচনা করে কোন বিবৃতি দিলেন। কিংবা শাসকদলের নানাবিধ দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুললেন। শাসকদল যে মুহুর্তে ভাবতে শুরু করলো, আপনার কথায় শাসকদলের বা শাসকদলের কোন নেতানেত্রীর কিংবা সরকারের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হতে পারে। সেই মুহুর্তেই শাসকদলের নির্দেশে সরকারী পুলিশ আপনার বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের বাতিল হয়ে যাওয় 66A ধারায় মামলা রুজু করে দিল। অত্বঃপর আপনি গারদের অপর পারে। আর দিনের পর দিন আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ঘটিবাটি বেচে মামলার খরচ জোগাতে থাকুন। তারপর কয়েক বছর পর যখন আপনি প্রমাণ করতে পারবেন, আপনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটিই সম্পূর্ণ ভুয়ো। কারণ যে ধারায় আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সেই ধারাটিই সম্পূর্ণ বেআইনি। ততদিন আপনার বয়স বেশ কয়েক বছর গড়িয়ে গিয়েছে। তা যাক। কিন্তু শাসকদলের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে গিয়েছে ততদিনে। বাকি দেশবাসীকে বুঝিয়ে দেওয়া গিয়েছে, শাসকদলের বিরুদ্ধে মুখ খুললে কপাল কিভাবে পুড়তে পারে। তাই নো ট্যাঁ ফুঁ। চোখ বুজে, যেখানে যে ক্ষমতায় সেখানে সেই শাসকদলের প্রতীকে ছাপ।

না, এইগুলি কল্পকাহিনী বা কোন মেগা সিরিয়ালের গল্প নয়। গত সোমবার সুপ্রীম কোর্ট এই মর্মে সকল রাজ্য সরকার এবং ইউনিয়ন টেরিটরি সহ হাইকোর্টগুলির রেজিস্টার্স জেনারেলদের উদ্দেশে নোটিশ জারি করেছেন, কি করে এই বাতিল হয়ে যাওয়া 66A ধারাটির ব্যবহার চলছে এখনো; সেকথা জানতে চেয়ে। সুপ্রীম কোর্ট গোটা বিষয়টির ভয়াবহতার বিষয়ে যথেষ্ঠ বিচলিত। আশা করা যায়, বিষয়টির সঠিক সমাধন হবে এইবারে। সমাধন যবেই হোক। ২০১৫ সালের পর থেকে আমরা পেড়িয়ে এসেছি প্রায় সাত বছর। অথচ এই সাত বছর ধরেই যেখানে যেমন খুশি, এই বাতিল হয়ে যাওয়া অসাংবিধানিক আইনী ধারার বেআইনী প্রয়োগ চলছে। পুলিশ বেআইনী ধারায় এফআইআর নিচ্ছে। নির্দোষ ব্যক্তির কন্ঠরোধ করতে বেআইনী ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া আইনে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামাল দায়ের করছে। এবং আদালতে একটি বাতিল হয়ে যাওয়া আইনের ধারায় অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করাও হচ্ছে। ভুয়ো মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার বদলে দিব্যি চলছে বছরের পর বছর। এক আধটা নয়। ঝুড়ি ঝুড়ি ভুয়ো মামলা। বেআইনী ধারায়। কি আশ্চর্য্য শাসন ব্যবস্থায় আটক আমরা সকলে। গোটা দেশটাই আইনভঙ্গকারীদের দখলে চলে গিয়েছে। তাদের কথাই এখন আইন। তাদের স্বার্থই এখন সংবিধান।

৩রা আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s