বনসাই সংস্কৃতি

শরীর একটা বড়ো ব্যাপার। শরীরটা যতক্ষণ, ততক্ষণই বাকি সব। শরীরটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই বাকি সব কিছু। শরীরটাকে টিকিয়ে রাখার জন্যেই জীবনযুদ্ধ। পরস্পর প্রতিযোগিতা হানাহানি। আবার সেই শরীরটাকেই শাখা প্রশাখায় প্রলম্বিত করার জন্যেই বংশবিস্তার। আদতে জীবজগতের আগাগোড়াই আসল গল্পটা একান্তই শারীরীক। মানুষের জীবনও সেইরকমই শরীর সর্বস্ব এক মহাকাব্য। এই শরীরটাকে জানার ভিতর দিয়েই মানুষের জীবনে প্রথম জ্ঞানলাভের সূচনা। সেই জ্ঞানার্জন আজও শেষ হয় নি। আজও যে শরীরের কত কথা অজানা রয়ে গিয়েছে, তার ঠিক নেই। আমরা অনেক সময় মনে করি। শরীর নিয়ে পড়ে থাকাটা প্রাগৈতিহাসিক আদিম ব্যাপার। বরং মনের ভিতরে আরও বেশি করে ঘোরাফেরা করাটাই আধুনিকতা। কিন্তু আমরা ভুলে যাই। মনও শরীরেরই প্রলম্বিত রূপ। এবং মনেরও শরীর রয়েছে। মনের মৃত্যু ঘটলেও শরীর জীবিত থাকতে পারে। কিন্তু শরীরের মৃত্যু ঘটলে মনের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়ে যায়। ফলে শরীরই মনের আধার। মন শরীরের আধার নয়। শরীর অনুভব করে। মন উপলব্ধি করে। দুই মিলেই একটা সম্পূর্ণ বৃত্ত। মনহীন শরীর মূল্যহীন। শরীরহীন মন অলীক।

জীবজগতে অন্যান্য জীবের থেকে মানুষের প্রভেদ বুদ্ধিতে নয়। অন্যান্য জীব শরীরের অনুশাসনে চলে। আর মানুষ শরীরকেই অনুশাসনে রাখে। এইখানেই বাকি সকল জীবজগতের সাথে মানুষের মূল পার্থক্য। আর এইখানেই মানুষ প্রকৃতির সাথে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। বাকি জীবকুল প্রকৃতির সাথে অনেক বেশি বা বলা ভালো একান্ত ভাবেই সম্পৃক্ত। প্রকৃতির সাথে এই একান্ত ভাবে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই অন্যান্য জীবকুলে অসুখ বিসুখ কম। আর মানুষ নিত্য নতুন অসুখ বিসুখে ভোগে। মানুষের ভিতরে আবার যারা আজও আদিম সভ্যতার অনেকটা কাছাকাছি জীবনযাপন করে। তাদের ভিতরে তুলনামূলক ভাবে কম অসুখবিসুখ দেখা যায়। এবং তাদের অসুখ বিসুখ হলেও তারা প্রকৃতির সাহায্য নিয়েই অধিকাংশ সময়ে দ্রুত সেরে উঠতে পারে। অর্থাৎ আমাদের সভ্য সমাজের ভাষায় বলতে গেলে, যাদের জীবনযাপনের মান যত নীচু। তাদের অসুখবিসুখ তুলনামূলক ভাবে কিছুটা কম। যদিও উন্নত সমাজসভ্যতার অভিশাপে প্রাকৃতিক দূষণের হাত থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না শেষমেশ। আরও একটি বিষয় দেখা যায়। ধনীদের ভিতর অসুখবিসুখ অনেক বেশি। কারণ তারা অনেক বেশি পরিমানে প্রকৃতিকে এড়িয়ে থেকে দৈনন্দিন জীবনযাপনে অভ্যস্থ। কিন্তু নেহাতই গ্রাম্যজীবনে অভ্যস্থ তথাকথিত অনুন্নত জীবনযাপনের বৃত্তে পড়ে থাকা মানুষের ভিতরে সেই তুলনায় অসুখ বিসুখ একটু কমই হয়। খাদ্যভাস এর বড়ো একটি কারণ। আরও একটি কারণ রয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনযাপনে মাঠেঘাঠে পড়ে থাকা মানুষের ভিতর স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ শক্তি তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকে। অর্থাৎ প্রকৃতির থেকে যত বেশি বিচ্ছিন্নতা। তত বেশি অসুস্থতা। না, শুধুই শরীরে নয়। শরীর এবং মনেও।

জীব জগতের সাথে মানুষের যেখানে প্রধান তফাৎ, অর্থাৎ শরীরের অনুশাসনে না চলা। উল্টে শরীরকেই অনুশাসনে রাখা। সেখানেই আমরা মানুষ হিসেবে পরাজিত হয়ে বসে রয়েছি। অধিকাংশ মানুষই প্রতিবাদ করবেন। সে কেমন কথা। শরীরকে অনুশাসনে না রাখতে পারলে, পশুর মতো জীবনযাপন করতে হয়। ঠিক কথা। কিন্তু পুরোটাও ঠিক নয়। শরীরকে নিরন্তর অনুশাসনে রাখতে রাখতে আমরা কিন্তু তলায় তলায় শরীরে অন্তরের একান্ত মনটাকেই মেরে ফেলে দিয়ে থাকি। মানুষের সমাজ সভ্যতা এই দিকটি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ চোখ বুঁজে রয়েছে। আর সেইখান থেকেই আধুনিক জনসমাজে জন্ম নিতে থাকে নানান ধরণের মনের অসুখ। মনের অসুখ কি শুধুই মনকে অসুস্থ রাখে? একদমই নয়। মনের অসুখ সকলের আগে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে তার আধার, সেই শরীরটাকেই। একবার মন অসুস্থ হলে, সে ক্রমাগত শরীরকে অসুস্থ করতে থাকে। আধুনিক সমাজ সভ্যতায় এটাকেই সবচেয়ে মারাত্মক সংক্রমক ব্যাধি বলা যেতে পারে। আমাদের বানিয়ে তোলা সমাজ আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যে সমাজকে নিয়েই গর্ব করে সবচেয়ে বেশি। যে সমাজের ভিতরে উপরেই মানুষের সভ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে। সেই সমাজই প্রকারন্তরে মানুষের শরীর ও মনের উপরে ক্ষতের সৃষ্টি করে চলে। মানুষের সমাজ যে কয়টি প্রধান নীতির উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই কয়টির ভিতর। আগেই বলেছি, প্রধানতম নীতিটি হলো শরীরের অনুশাসনে না চলে, শরীরকেই অনুশাসনে বেঁধে রাখা, ধরে রাখা, খর্ব করে রাখা। এককথায় যাকে বলে বনসাই করে রাখা। জীবজগতে একমাত্র মানুষই তার নিজের শরীরকে বনসাই করে রাখে। আর সেই রাখার প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই সে সভ্যতার ইমারত গাঁথতে থাকে। একে কি বলবো? সভ্যতার সংকট? নাকি সভ্যতার অভিশাপ? মানুষের ইতিহাসকেই শেষ বিচার করতে হবে।

১লা আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s