সেলিব্রেটিদের সমাজসেবা

মন্ত্রীত্ব হারিয়ে তাঁর বোধদয় হলো, রাজনীতি বাদ দিয়েও সমাজ সেবা করা যায়। যদিও তিনি পূর্ণ মন্ত্রীত্ব পাননি কোনদিন। শোনা যায় প্রতিমন্ত্রীদের টেবিলে কোন ফাইল গিয়ে পৌঁছায় না। কিন্তু মন্ত্রীর ঠাটবাঁট সুযোগ সুবিধে আর্থিক সমৃদ্ধি সবই পাওয়া যায়। ফলে রাজনীতির ময়দানে হাফ মন্ত্রীরও উচ্চদর। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ গাড়ীর বনেটে উপরে বসে সেদিন সেই দর হাতে কলমে দেখিয়েও এসেছিলেন। স্বয়ং রাজ্যপালকে ছুটে আসতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে নয়। কেন্দ্রের শাসকদল মনোনীত রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান করে, সেদিন এই হাফ মন্ত্রীকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখে ধুলো দিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। এতটাই তাঁর প্রতাপ। এতই তাঁর উচ্চদর। সেইমতই তাঁর চলাফেরা। সেইমতই ভাষণ দেওয়া। বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরকে কথার ধারে একেবারে ধরাশায়ী করে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক সত্তাকে নিরন্তর খরবের শিরোনামে রাখার বিষয়ে, তিনি অনেকের থেকেই কয়েক কদম এগিয়ে। তার আরও একটি কারণ অবশ্যই শিল্পকলা জগতে তাঁর জনপ্রিয়তা। সেই জনপ্রিয়তা ভাঙ্গিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর তকমাতেই এতদিন মুখে জগৎ মারিতং। সেই তিনিই নাকি, মনে করছেন রাজনীতি ছাড়াও সমাজসেবা করা যায়। না, একথা মন্ত্রীত্ব থাকা কালীন তাঁর একবারও মনে হয়নি। মনে হচ্ছে মন্ত্রীত্ব হারানোর পর থেকেই। তাও পূর্ণ মন্ত্রী নয়। প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রীত্ব যে ভারতীয় রাজনীতিতে কতটা মহার্ঘ্য। সেটি বুঝতে এই ঘটনাই যথেষ্ঠ। পূর্ণ মন্ত্রী হলে না জানি তাঁর অবস্থা কি হতো। ফলে সদ্য সমাপ্ত মন্ত্রীসভা রদবদলে তাঁর যে পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ার একটা সাধ ছিল। একথা চোখ বুঁজেই বলে দেওয়া যায়। কিন্তু কথায় বলে। মানুষ ভাবে এক। হয় আর এক। তাঁর দুর্ভাগ্য। তাঁর ভাগ্যেই প্রবাদবচন এমন সত্য করে ফলে গেল। যাও বা একটা হাফ মন্ত্রীত্ব ছিল। এবারের সদ্য সমাপ্ত মন্ত্রীসভা রদবদলে সেটিও হাতছাড়া হয়ে গেল। স্বপ্ন সাধ সাধনা ধুলিস্মাৎ হয়ে নিজের দলের ভিতরেই তিনি আজ অপ্রাসঙ্গিক। তিনি হয়তো জানতেন না। তিনি যে রাজনৈতিক দলের মঞ্চে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দলের সর্বভারতীয় দিগন্তে, বাংলা থেকে নির্বাচিত বাঙালি প্রতিনিধিদের বেশিদিন উড়তে দেওয়া হয় না। বেশি উড়তে গেলে ডানা ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়। এই কারণেই তাঁর কাছ থেকে তাঁর সাধের মন্ত্রীত্ব ছিনিয়ে নেওয়া। না তাই বলে তাঁকে যে সামান্য সাংসদ হিসেবেই দলের একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে দলের সকল নির্দেশ এবং দলীয় নেতানেত্রীর হুকুম তামিল করে যেতে হবে। তেমনটা নাও হতে পারে। আর যাই হোক আর পাঁচজন রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মতো রাজনীতিটাই তাঁর একমাত্র পেশা নয়। রাজনীতিতে তিনি এসেছিলেন, আপন পেশায় লব্ধ প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশব্যাপী জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করে। ফলে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেও তাঁর ভাতের অভাব হবে না। আর সেই বার্তাটুকুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বৃত্তে পৌঁছিয়ে দিতেই তাঁর আজকের ফেসবুক পোস্ট। এখন এহেন ভদ্রলোকের রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ কোনদিকে গড়াবে। সে তো সময়ই বলবে। আমরা বরং একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি, রাজনীতি ও সমাজসেবার ভিতরে প্রাসঙ্গিক সম্পর্কসূত্রটুকুই।

অনেক সময়েই আমরা দেখে থাকি। আপন পেশায় বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিরা তাঁদের পেশাগত জনপ্রিয়তাকে ভাঙ্গিয়ে নির্বাচনে জিতে রাজনীতিতে পা রাখেন। যে কোন গণতন্ত্রে, যে কোন ব্যক্তির সেই অধিকার রয়েছে। আমাদের দেশে বিশেষ করে, এই পথে বহু তাবড় তাবড় মানুষ রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন জনসেবা সমাজসেবার অজুহাত দিয়েই। ফেসবুক পোস্টে সমাজসেবার জন্য রাজনীতি করা অনিবার্য্য নয় বলে মত ব্যক্ত করার বহু পূর্বেই সদ্য মন্ত্রীত্ব হারানো বিখ্যাত শিল্পী তাঁর রাজনীতিতে আসার কারণ হিসোবে, সেই সমাজসেবার তত্ত্বই আউড়ে ছিলেন নিশ্চয়। অন্তত তেমনটাই সকলে করে থাকেন। আমাদের দেশে স্বক্ষেত্রে খ্যাতনামা ব্যক্তি মাত্রেই যখনই রাজনীতিতে পা রাখেন। প্রায় মুখস্থ বুলির মতো একটাই কথা আউরিয়ে যান। সমাজসেবা করার বাসনা পূর্ণ করতেই রাজনীতিতে আগমনের কথা বলে। এইতো সদ্য সমাপ্ত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আর এক মেগাস্টার। তাঁর তরুণ বয়স থেকে লালন করে আসা সমাজসেবা করার বাসনা পূর্ণ করতেই জীবন স্বায়াহ্নে উপস্থিত হয়ে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের পতাকা হাতে করে সেই দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের এক ছোবলেই ছবি ক’রে দেওয়ার হুঁশিয়ারী দিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ নিজের জনপ্রিয়তা ভাঙিয়ে রাজনীতিতে করে কর্মে খেতে বহু তাবড় তাবড় সেলিব্রেটিই সমাজসেবার অজুহাতে রাজনীতিতে পা রাখেন। তারপর বিধায়ক, সাংসদ এবং মন্ত্রী অব্দি উঠতে পারলে তো কথাই নেই। টিভি নিউজের ফোকাসে থাকলেই সমাজসেবা হয়ে যেতে থাকে। সেই হেন সমাজসেবা করার জন্য নাকি রাজনীতিতে না থাকলেও হয়। ভুতপূর্ব প্রতিমন্ত্রীর এহেন বোধদয়ে দেশবাসী যথেষ্ঠ পরিমানে সচকিত। আন্দোলিত। এরপর বাকি সেলিব্রেটিরাও যদি দেশশুদ্ধ এই কথাই কায়মনবাক্যে বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয়। তবে তো মুশকিল। রাজনৈতিক দলগুলি বহু আসনে নির্বাচনী প্রার্থীই তো দিতে পারবে না। কি হবে তখন ভারতীয় গণতন্ত্রের? তেমন অঅঅঅঅঅসম্ভবও যদি সম্ভব হয়?

৩০শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s