অলিম্পিকের পদকতালিকায় বাঙালি

যতদূর বাংলা ভাষা ততদূর বাংলা। স্বাধীন বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরা। এবং উত্তরপূর্ব উড়িষ্যা। ঝাড়খণ্ড বিহারের পূ্র্বাঞ্চল। আসামের শিবসাগর গোয়ালপাড়া আর বরাক উপত্যাকা। এই বিস্তীর্ণ ভুখণ্ডই বাঙালির আদিনিবাস। সারা বিশ্বে বাঙালির দশা প্রায় অনন্য। বিশ্বে খুব কম জাতিই রয়েছে। এমন শতটুকরো হয়ে যাদের দেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও প্রাদেশিক মানচিত্রে খণ্ড বিখণ্ড। এই এতগুলি ভিন্ন মানচিত্রের ভিতরে বিভক্ত বাঙালির মোট জনসংখ্যা প্রায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার কাছাকাছি। গোটা বিশ্বই যে দেশের কব্জায় আটকিয়ে পড়ে রয়েছে। এমনই তার প্রতাপ। এতই তার ক্ষমতা। পৃথিবীর একমাত্র সুপার পাওয়ার। সেই জাতির জনসংখ্যার কাছাকাছি জনসংখ্যা নিয়ে, আর সব কিছুই ছেড়ে দিয়েও। যদি প্রশ্ন করা যায়, বাঙালি অলিম্পিকে কয়টি পদক পাচ্ছে? উত্তরটা কিন্তু একটি মহা শূন্যেই থমকে দাঁড়িয়ে রইবে। বিগত অলিম্পিকগুলির মতোই বাঙালির পদকপ্রাপ্তি শূন্যেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। দাঁড়িয়ে থাকবেও। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কি আদৌ কোনদিন কোন পদক জিতেছে অলিম্পিকে? না। আমার অন্তত জানা নেই। জানা নেই কয়জন বাঙালি আলিম্পিকে আজ অব্দি পদক জিতেছেন। বা আদৌ জিতেছেন কিনা? কেন বাঙালি অলিম্পিকে পদক পায় না? অনেকেই বলবেন। সেতো অনেক দেশই অলিম্পিকে পদক পায় না। পদক তো হাতে গোনা কয়টি মাত্র দেশই নিজেদের ভিতরে ভাগ করে নেয়। ভালো কথা। তাহলে কি বাঙালির অলিম্পিকে পদক জয়ের কোন দরকার নেইঁ? বাঙালি কি বিশ্ব খেলাধুলোর অঙ্গনে চিরকাল শেষ সারিতে পড়ে থাকবে? না, আসলে এই প্রশ্নগুলি আমারা আদৌ করতে অভ্যস্থ নই। বাঙালির সামাজিক পরিকাঠামোয় আর যাই হোক বিশ্বমানের খেলোয়ার তৈরী হয়ে ওঠে না। হ্যাঁ একথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু না, তার জন্য বাঙালির দুঃখ কি? বাঙালি যে খেলাটি নিয়ে বুক বাজিয়ে থাকে। সেই ক্রিকেটেই কি বাঙালি বিশ্বজয় করতে পেরেছে কোনদিন? হাতে গোনা মাত্র কয়টি দেশ যে খেলাটি খেলে সময় নষ্ট করে। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলার ছেলে সৌরভের হাতে একবারই মাত্র সুযোগ এসেছিল। দলনায়ক হিসেবে বিশ্বচ্যম্পীয়ন হওয়ার। কিন্তু সে সৌভাগ্য অধরাই রয়ে গিয়েছে আজো। আর বাঙালির সবচেয়ে বড়ো জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের কথা যত কম বলা যায়। ততই ভালো। এককালে ফুটবলে বাঙালির যে সুনাম ছিল। আজ তার ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। ১৯১১ সালে এগারো জন বাঙালির খালি পায়ে খেলে বুট পায়ের বিদেশীদের হারিয়ে আইএফে শীল্ড জয়ের মতো নজির আর কই? দিনে দিনে বাঙালি ফুটবল বিশ্ব থেকে হঠতে হঠতে পাড়ার প্রতিযোগিতায় এসে পৌঁছিয়েছে।

না বাঙালি হিসেবে আমাদের কারুরুই অলিম্পিকে বাঙালির পদক জয় নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নাই। বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সকর সেরা সেরা ক্রীড়াবিদদের বায়োডাটা আমাদের মুখস্থ। তাদের জয়ের গৌরবেই আমাদের আনন্দ। বাঙালির মতো এমন বিশ্বনাগরিক আর কেউ আছে নাকি? বাকি দেশগুলির মানুষেরা সাধারণত অন্যান্য দেশের অন্যান্য জাতির খেলোয়ারদের নিয়ে বাঙালির মতো এমন করে মাথায় তুলে নাচতে অভ্যস্থ নয়। কিন্তু বাঙালির তাতেই আনন্দ। বাঙালি প্রশ্ন করে না, কেন কোন বাঙালি অলিম্পিকে যাওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না? কিংবা দৈবাৎ গেলেও শেষ করে পিছনের সারিতে থেকেই। জাতিগত ভাবে বাঙালির অলিম্পিকের কোন ইতিহাস নেই কেন? না আমরা আসলে সেই সব বিষয়ে আদৌ আগ্রহীই নই। আমাদের আগ্রহ বরং রাজনীতিতে। সেও একটা খেলার ময়দান। আঠারো থেকে আঠাশ বছরের যুবসম্প্রদায়ের একটা বড়ো অংশকেই আমরা কত সুন্দর ভাবে সেই রাজনীতির মাঠে খেলতে নামিয়ে দিয়েছি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের যুবক যুবতী তরুণ তরুণীরা যখন খেলাধুলাকে পেশা হিসাবে নেওয়ার সাধানায় ব্যস্ত থাকে। আমাদের বাঙালি ছেলেমেয়েদের একটা বড়ো অংশকেই আমরা তখন রাজনীতির মাঠে নামিয়ে দিই। হাতে কোন একটি রাজনৈতিক দলের পতাকা ধরিয়ে দিয়ে, মিটিং মিছিলে মাথার সংখ্যা বাড়ানোর খেলায় তাঁদেরকে কত সহজেই না কাজে লাগিয়ে থাকি আমরা! স্কুল কলেজে যখন শরীর গঠন বুদ্ধিবৃত্তি গঠন মেধা গঠনের সময়। তখন থেকেই আমাদের স্কুল কলেজগুলিতে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ছাত্রসংগঠনের ঠেক খুলে দিয়ে দলভারী করার কাজ শুরু করে দেয়। নেতা মন্ত্রীর পিছনে ভিড় বাড়াতে হবে। জনসভা পূর্ণ করতে হবে। ভোটের সময় বুথে বুথে ভোট করাতে হবে। বিপক্ষ দলের থেকে রাজনৈতিক জমি কেড়ে নিতে হবে। আমাদের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল ছাত্র যুব সম্প্রদায়কে সেই সব কাজে লাগিয়ে দেয় একেবারে শুরু থেকেই। বয়স সতেরো আঠারো পেরোতে না পেরোতে ছেলেমেয়েরা রাজীনীতির ময়দানে খেলাধুলা করতে নেমে যেতে শুরু করে দেয়। আর সেই পথ ধরেই একদশক হাতপাকিয়ে এক একজন নেতা উপনেতার ডান হাত বাম হাত হয়ে উঠে রাজনৈতিক দলগুলির জনসম্পদে পরিণত হয়ে যায়। আজকে যাদের আমরা তোলাবাজি চাঁদাবাজি, বোমাবাজি, জুলুমবাজি ইত্যাদি পেশায় স্বনামখ্যাত হতে দেখি। তারা সকলেই এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই গড়ে উঠেছে। বাংলায় তাই রাজীনীতির খেলায় তরুণ তরুণী খেলোয়ারের কোন অভাব নেই। কিন্তু অলিম্পিকের খেলায় অভাব রয়েছে। আমাদের বাংলায় রাজনীতিবিদদের পেশাগত কারণেই এই যুবসম্প্রদায়ের প্রয়োজন। অলিম্পিকে যাওয়া যুবসম্প্রদায়ের কোন প্রয়োজন আমাদের দেশে নাই। আসল মুশকিলটা ঠিক এইখানেই।

৩০শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s