পেগাসাস কেলেঙ্কারি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা

পেগাসাস ইস্যু নিয়ে দেশ উত্তাল। প্রতিটি দেশপ্রেমিক ভারতীয়ই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শাসকদল বিরোধীরা পেগাসাস কেলেঙ্কারিকে হাতে গরম রাজনৈতিক অস্ত্র করে তুলতে উঠে পড়ে লেগেছে। এবং গণতন্ত্রপ্রেমী প্রতিটি মানুষই ফোনে আড়ি পাতার বিষয়টিতে যথেষ্ঠই ভীত সন্ত্রস্ত। শুধুমাত্র শাসকদলেরই মুখে রা নেই। সরকার এই কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত কিনা। সেই বিষয়ে সরকার মুখে কুলুপ এঁটেছে। সরকার এই বিষয়ের সাথে কোনভাবেই জড়িত নয়। এমন কোন কথাও সরকার পক্ষ এতদিনেও বলে উঠতে পারেনি। মানুষ জানতে চাইছে, যদি সরকার জড়িত না থাকে। তবে কারা এই কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত? এতে দেশের নিরাপত্তাই তো সকলের আগে বিঘ্নিত হতে পারে। না, দেশের নিরাপত্তা, দেশবাসীর সুরক্ষা এসব বিষয় নিয়ে সরকারের কোন উদ্বেগ চোখে পড়ছে না। পড়লে সরকার এতদিনের ভিতরে অনেক আগেই বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত শুরু করতে পারতো। ঠিক যেমনটি করেছে ফ্রান্স সরকার। ফলে একথা নিশ্চিত। পেগাসাস কেলেঙ্কারির বিষয়টিকে দেশের নিরাপত্তা ও দেশবাসীর সুরক্ষার সাথে জড়িত ভাবতে স্বীকৃত নয় বর্তমান সরকার। আর এইখানেই যে কোন সাধারণ সচেতন দেশবাসী সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতে বাধ্য। একটি বিদেশী দেশ। তাও আবার ইজরায়েলের মতো একটি সন্ত্রাসবাদী দেশ। যাদের সাত আট দশকের বেশি সময় ধরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তেমন একটি দেশের হাতে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য রয়ে যাবে। এবং সেই তথ্য কোটি কোটি টাকায় তারা বেচাকেনা করতে থাকবে। এরকম একটা পরিস্থিতি আমাদের দেশের পক্ষে কতটা বিপদজনক সেটা বুঝতে খুব একটা লেখাপড়া জানার দরকার হয় না নিশ্চয়। খুব সাধারণ বুদ্ধিতেই বিষয়টির ভয়াবহতা উপলব্ধি করা সম্ভব।

এখন অব্দি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে, পেগাসাস নামক এপ্লিকেশনটি ইজরায়েলের কোম্পানি আদৌ ভারতকে বিক্রী করে নি। আর এইটি জেনেই বিপদের গুরুত্ব আঁচ করা সম্ভব। পেগাসাস বোফর্স কামান কিংবা রাফায়েলের বিমান কেনার মতো বিষয় নয়। ভারত সরকার যখন কামান বন্দুক যুদ্ধ বিমান ইত্যাদি কেনে। তখন সেই অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার সরকারের নিজের হাতেই থাকে। কেনার প্রক্রিয়ায় দূর্নীতি থাকলেও, অস্ত্রের মালিকানা ও ব্যবহারের স্বাধীনতা সরকারের হাতেই থাকে। কিন্তু পেগাসাসের ঘটনাটি অন্যরকম। এটিও একটি অস্ত্র। হ্যাকিং অস্ত্র। কিন্তু সেই অস্ত্রটি, অর্থাৎ সফ্টওয়্যার প্রোগ্রামিং এর এপ্লিকেশনটি কিন্তু ভারত সরকারের হাতে নেই। বোফর্সের কামান রাফায়েলের বিমানের মতো। ফলে বিষয়টির গুরুত্বও ভিন্ন। সরকার শুধু পঞ্চাশ জন পশ্চাশ জন করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বরগুলি ইজরায়েলের সংশ্লিষ্ট কোম্পানীটির কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যার জন্যে সরকারের প্রতি পঞ্চাশ জনের মোবাইল নম্বর হ্যাক করানোর খরচ বাবদ বিদেশী কোম্পানীটিকে দিতে হচ্ছে ষাট কোটি করে টাকা। অর্থাৎ একটি মোবাইল নম্বর পিছু এক কোটি টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এতেই প্রমাণিত যে ভারতবর্ষের সরকার পেগাসাস এপ্লিকেশনটি নিজেদের হাতে পায় নি। এখন পেগাসাসের যাঁরা মালিক। তারা ইজরায়েলে বসে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সেনা আধিকারিক, বিচারপতি, সরকারী আমলা থেকে শুরু করে প্রাইম মিনিস্টারের অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিক, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের উচ্চতম পদাধিকারী সহ বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ফোন হ্যাক করে সকল অডিও ভিডিও টেক্সট এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ইত্যাদি সব কিছু হাতিয়ে নিচ্ছে। এবং সেই সকল তথ্য বিশ্লেষণ করে চলেছে। সেই তথ্য ভারতীয় সরকারের হাতে দিক আর নাই দিক। দেশের তথ্যগুলি কিন্তু ইজরায়েলের মতো একটি সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের হাতে রয়ে যাচ্ছে। যে কোন স্বাধীন সার্বভৌম দেশের পক্ষে এইরকম একটি অবস্থা চুড়ান্ত বিপদজনক এবং লজ্জাজনক সন্দেহ নাই। সরকার যদি ওয়ান টাইম পার্চেজের ভিত্তিতে পেগাসাস এপ্লিকেশনটি কিনে নিয়ে সেটিকে নিজ সিস্টেমে ইনস্টল করে চরবৃত্তি চালাতো। তাহলে নয় এক কথা ছিল। কিন্তু ঘটনা সেটি নয়। ঘটনা হলো, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে হাজার হাজার ভারতীয়ের মোবাইলে চরবৃত্তি করার লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে ইসরায়েলের মত চরম সন্ত্রাসবাদী একটি রাষ্ট্রের এক কোম্পানীর হাতে। একটি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে এর থেকে চরম দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড আর হতে পারে কি? এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে আমাদের প্রত্যেককে। কথায় বলে চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। বর্তমান শাসকদলের অন্ধভক্তের কোন অভাব নেই। কিন্তু দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে অন্ধভক্তরাও রক্ষা পাবেন না কিন্তু। ফলে আজকে শাসকদলপন্থী শাসকদল বিরোধী সকলের আসল সত্য জানতে চাওয়ার অধিকার রয়েছে। দায়িত্ব রয়েছে। কর্তব্য রয়েছে। যদি আপনি আমি আমরা দেশপ্রেমী হই। ভারতপ্রেমী হই। প্রকৃত ভারতীয় হই।

যাঁরা এর ভিতরেও প্রচার করছেন। পেগাসাস একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। ভারতবর্ষকে বদনাম করতে। পেগাসাস কাণ্ডে বর্তমান শাসকদল কোনভাবেই জড়িত নয়। তাঁদের তো তাহলে আরও বেশি করে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠা উচিত। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে একটি সরকার থাকতে। বিশেষ করে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির সরকার থাকতে, সরকারের নাকের ডগায় এই রকম চরবৃত্তি বছরের পর বছর চলতে থাকলো কি করে? যারা এখন শাসকদল বিরোধী ব্যক্তিবর্গের মোবাইল হ্যাক করে চরবৃত্তি করছে, তারা যে কাল দেশের সেনা বিভাগের উপরে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির উপরে একই ভাবে চরবৃত্তি করবে না। তার নিশ্চয়তা কে দেবে? বর্তমান সরকার? এরপর ইজরায়েল থেকে ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকেও ব্ল্যকমেল করা শুরু হলে অন্ধভক্তের সামাল দিতে পারবে তো?

২৮শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s