কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক

রাজ্যে ২০১১ সালের পরিবর্তনের পর থেকে সরকারী বেসরকারী উভয় ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের সুযোগ কমতে কমতে প্রায় তলানিতে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান তো দূরের কথা। ভারত সরকারের অধীনস্ত বিভিন্ন সরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানেও নতুন কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়া রুদ্ধ প্রায়। রাজ্যের অধীনস্থ সরকারী দপ্তর ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরী হয়নি বিশেষ। হাজার হাজার শূন্যপদ খালি পড়ে রয়েছে। রাজ্য সরকারের কাছে কর্মসংস্থানের বিষয়টি ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যতটা গুরুত্বপূর্ণ সমাজের সকল স্তরে সরকারী দাতব্য পৌঁছিয়ে দেওয়া। তার জন্য গণ্ডায় গণ্ডায় সরকারী প্রকল্প তৈরী হচ্ছে। আর মানুষ লাইন দিয়ে সেই সব প্রকল্পে নানাবিধ সরকারী ভাতা পাওয়ার খাতায় নাম লেখাচ্ছে। কেন্দ্র সরকারও এই বিষয়ে একই পথের পথিক। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে সরকারী ভাতায় জনগণকে নির্ভরশীল করে রাখতে পারলে, পাঁচ বছরের শেষে ভোটের হিসেবটি নিশ্চিত রাখা সহজ। মানুষ সরকারী ভাতায় অভ্যস্থ হয়ে গেলে, দিনে দিনে অলস এবং অকর্মণ্য হয়ে উঠবে। এবং সেই ভাতার অধিকার নিশ্চিত করতেই শাসকদলের বশংবদ হয়ে থাকবে। শাসন ক্ষমতা ধরে রাখার অভিনব ফর্মূলা সন্দেহ নাই। এরই সাথে কেন্দ্র সরকার প্রায় সব সরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানই বেসরকারী মালিকানায় হস্তান্তর করে দিচ্ছে। ফলে কাজ হারাচ্ছে হাজার হাজার সরকারী কর্মচারী। সরকার দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের দায় ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছে। ওয়েল ফেয়ার স্টেটের পথে আমাদের দেশ চলবে না। আমাদের দেশ চলবে, ফেল কড়ি মাখো তেল নীতিতে। আমাদের দেশ চলবে গুটি কয়েক কর্পোরেট হাউজের মুনাফার স্বার্থে। রাষ্ট্র সেই কর্পোরেট হাউজগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থের সুরক্ষায় দিবারাত্র কাজ করে চলবে অতন্দ্র প্রহরায়। ২০১৪ সালে নব নির্বাচিত দেশ প্রধানের চৌকিদারী দায়িত্বের সেই শুরু। মানুষ আসল কথটা বুঝতে পারেনি। সে মানুষের বুদ্ধির খামতি। ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের বিষয়টি এখন নিয়ো লিবারেল অর্থনীতির ইচ্ছাধীন। কর্পোরেট হাউজগুলির স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে রাষ্ট্রের যতটা প্রয়াজোন, রাষ্ট্র ততটুকুই কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে। দেশের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে যতখানি প্রয়োজন, ততখানি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে না আর। আর কর্পোরেট হাউসগুলিও, অটোমোশান প্রক্রিয়ায় উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কর্মসংস্থান করবে। এরফলে কর্মসংস্থানের পরিসর ও ক্ষেত্র দিনে দিনে সঙ্কুচিত হতেই থাকবে। নিও লিবারেল অর্থনীতির একটা বড়ো দিক হলো সারপ্লাস লেবার সৃষ্টি করা। এর ফলে বেতন মজুরী দুই কম রাখা যায়। শ্রমের উৎপাদন যত শস্তা হবে, নীট মুনাফা তত বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান ভারত সরকারের এটাই অঘোষিত নীতি। কারণ সরকারকে যারা অন্তরাল থেকে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রীত করছে, তেমনটাই তাদের নির্দেশ। সরকার সেই নির্দেশ পালনে দায়বদ্ধ।

ফলে জনসাধারণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, নাগরিকের জীবনযাপনের মানের উন্নয়নে সরকারের দায়বদ্ধতার আর প্রশ্ন থাকছে না। শুধু ভোটের লাইনে সংখ্যাগুরু জনতাকে ধরে রাখতে সরকারী ভাতার বিষয়টিকে প্রচারের আলোয় সবসময়ে উদ্ভাসিত করে রাখতে হবে। রাজ্য সরকার আবার এই সরকারী ভাতার প্রকল্পকে প্রায় শিল্পের পর্যায় উন্নীত করে ফেলেছে। যত বেশি সরকারী ভাতা ও দান খয়রাতি, তত নিশ্চিত ভোট। যত বেশি সরকারী প্রকল্প তত বেশি কাটমানি। আর তত বেশি শাসকদলের পক্ষে সক্রিয় কর্মী সমর্থক। ফলে একদিকে কেন্দ্র সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। আর অন্যদিকে রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা। দুইয়ের কর্ম পদ্ধতিতে একটি জায়গায় মিল রয়েছে। জনতাকে দান খয়রাতি সরকারী ভাতার উপরে নির্ভরশীল করে রাখা। ফলে জনতার অর্থনৈতিক পরাধীনতার পরিসর যত বিস্তৃত হবে। জনতা তত শাসকদলের বশংবদ হয়ে থাকবে। যেভাবেই হোক, সরকারী ভাতা অনুদান ইত্যদির জন্য দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে। এবং আগেই যেমনটি বলা হলো। অলস ও অকর্মণ্য হয়ে উঠবে। সেই জনতা সহজে শাসকদলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো অবস্থায় থাকবে না। শাসকদলের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ থাকলে তারা কর্পোরেট হাউজগুলির স্বার্থে আরও বেশি করে কাজ করে যেতে পারবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক ঠিক এই অভিমুখেই সাফল্যের সাথে এগিয়ে চলেছে। রাজ্যের শাসকদল বলে চলেছে নিরন্তর উন্নয়নের গল্প। রাজ্য সরকারের ভাতা ও অনুদানের প্রকল্প যত বৃদ্ধি পায়, ততই উন্নয়ন নাকি নিশ্চিত হয়। আর কেন্দ্র সরকার বলে চলেছে সব কা সাথ। সবকা বিকাশ। শুধু স্বীকার করছে না। ‘সব’ আসলে একটা সর্বনাম। যার পেছনে আসল মালিক কর্পোরেট হাউজগুলি। ফলে এইসব লক্ষ্য ও পরিকল্পনার সফল রূপায়নের স্বার্থেই দেশের জনতাকে সবসময়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে বিভক্ত করে রাখা দরকার। নাগরিকত্বের প্রশ্নে ব্যাতিব্যাস্ত করে রাখা দরকার। ধর্মীয় উন্মাদনায় উন্মত্ত করে রাখা দরকার। অশিক্ষা এবং কুসংস্কারের আবর্তে ধরে রাখার দরকার। দান খয়রাতি সরকারী অনুদান ও ভাতা নির্ভর করে রাখা দরকার। বিগত সাত বছরে ভারতবর্ষ এই বিষয়ে বিশ্বে চ্যম্পিয়ন হয়ে উঠেছে নিঃসন্দেহে।

২৭শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s