বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আচার্য

আচার্য শব্দটির ভিতর একটি পবিত্র অনুষঙ্গ রয়েছে। যার মূল অভিমুখ হচ্ছে মঙ্গলসাধন। অর্থাৎ হিত সাধন। আচার্য বলতে আমরা বুঝি যিনি দীক্ষাগুরু। যিনি দীক্ষিত করেন। দীক্ষিত করেন মানবকল্যাণের লক্ষ্যে। তিনিই আচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানও সেই আচার্য নামেই অভিহিত হয়ে থাকেন। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হলো স্বাধীন ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য হন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান হিসাবে যিনি নিযুক্ত থাকেন, অর্থাৎ সেই রাজ্যপাল। যাঁর সাথে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন গবেষণাকর্ম শিক্ষাবিস্তার ইত্যাদি কোন কর্মেরই যোগ থাকে না। এবং একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মাত্র আচার্য! বিস্ময়ের আর বাকি কি থাকে? আচার্য বলতে আমাদের স্মরণে আসে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য অতীশ দীপঙ্করের নাম। যাঁর সারাজীবনের ধ্যানজ্ঞান শিক্ষাপ্রদান ও শিক্ষাবিস্তারকর্মেই নিয়োজিত ছিল। আমাদের স্মরণে আসে শীলভদ্রের নামও। এঁরা শিক্ষাবিস্তারে নিবেদিত প্রাণ মানুষ ছিলেন। তাই ইতিহাসে তাঁদের স্থায়ী আসন। অর্থাৎ একজন আচার্য নির্দিষ্ট একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসাবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় ভালোমন্দের জন্য দায়ী থাকবেন। এমনটাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু এইযে রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান হিসাবে নিযুক্ত রাজ্যপালকে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসাবে নিয়োগ করার রেওয়াজ, এই প্রথা বা রীতি কিংবা নীতি কোনটাই দেশের শিক্ষাবিস্তারের পক্ষে মঙ্গলজনক কিনা, সেই কথা বিবেচনা করার সময় এসেছে। রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের অনেক বড় দায়িত্ব হল রাজ্যের মন্ত্রীসভার সহায়তায় রাজ্যকে পালন করা। তাই তিনি রাজ্যপাল। সেখানে সেই একই ব্যক্তির পক্ষে কিভাবে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব? আচার্যের দায়িত্ব কি শুধুই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মঞ্চ আলো করে বসে থাকা আর পরীক্ষার শংসাপত্র প্রদান করা?

অনেকেই জানেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কর্মব্যবস্থাপনার শীর্ষে বসে থাকেন উপাচার্য। সাংবিধানিক ভাবে যিনি রাজ্যপালের হয়ে তাঁর সকল কর্ম সম্পাদন করেন। তাই তিনি উপাচার্য। তাহলে এই প্রশ্নই কি ওঠা উচিৎ নয়, তবে আর আচার্য হিসাবে রাজ্যের রাজ্যপালকে মাথার উপর বসিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা কি? এ যেন রামের সিংহাসনকে সাক্ষি রেখে ভরতের দেশশাসনের মতো বন্দোবস্ত! একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোমন্দ আশা আকাঙ্খা লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি প্রভৃতি সকল বিষয়ের সাথেই নাড়ীর যোগ থাকে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের। যিনি আচার্যের বকলমে যাবতীয় সকল কর্মসম্পাদনার জন্য দায়ী থাকেন। তাই তিনিই তো আসল আচার্য। হ্যাঁ সুষ্ঠভাবে সকল দায়িত্ব সামলানোর জন্য তাঁর অধীনে এক বা একাধিক উপাচার্যও থাকতে পারে। তাহলে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় আরও উৎকর্ষতার সাথেই পরিচালিত হতে পারে।

যাবতীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলিকে বাদ দিয়েও একথা বলাই যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের পদে তিনিই থাকুন, যাঁর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থের উর্দ্ধে অন্য কোন বিষয়ই প্রাধান্য পাবে না। যাঁর কর্মজীবনের প্রধানতম লক্ষ্যই হবে শিক্ষার প্রসারে ছাত্রছাত্রীদের দীক্ষিত করে তোলা। এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে একজন আচার্য। যিনি সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধির বিষয়টি নিজের হাতে দেখাশোনা করতে পারবেন। অর্থাৎ সেই যোগ্যতার অধিকারী হবেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় ভালোমন্দের বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকবে। ফলে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালগুলিতে বর্তমানে যাঁরাই উপাচার্যের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তাঁরাই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসাবে কর্মসম্পাদনের দায়িত্বে থাকলেই আর মাথার উপরে নিষ্কর্মক আচার্য হিসাবে রাজ্যের রাজ্যপালকে বসিয়ে রাখার দরকার পড়ে না।

২৩শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s