সকলেই পাশ অনেকেই প্রথম

এই প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষায় সকলেই পাশ। শুধু তাই নয়। বিশ্ব রেকর্ড করে ৭৯ জন পরীক্ষার্থী প্রথম! সম্ভবত গিনস বুক অফ রেকর্ডসেও এই রেকর্ড ধরানো যাবে না। এমনই বহর রেকর্ডের। এই প্রথম পরীক্ষায় না বসেই সকলেই পাশ। পরীক্ষায় না বসেই ৭৯ জন প্রথম। না, শুধু যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাধ্যমমিক পরীক্ষা নিতে পারেনি তা নয়। পরীক্ষা নিতে পারেনি দিল্লী বোর্ডও। এমন নয় কেন্দ্র সরকার ও রাজ্য সরকারের ভিতরে দক্ষতা ও যোগ্যতার তারতম্য রয়েছে। তারতম্য যেটুকু দেখা যাচ্ছে। সেটি কেরলে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক বেশি করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর বহর নিয়েও কেরল সরকার সুচারু রূপে মাধ্যমিক সমতুল্য পরীক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসলে প্রশ্নটা হলো দক্ষতার। তারও আগে যোগ্যতার। সরকারের সঠিক যোগ্যতা না থাকলে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থ হতে বাধ্য। বা কাজই করবে না। পশ্চিমবঙ্গের এবং কেন্দ্রের সরকার এই বিষয়ে একে অপরকে টেক্কা দিয়ে কোন পরীক্ষাই গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে মুখরক্ষা করতে সকলকেই পাশ করিয়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু এর ফলে পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ভিতরেই আট দফার নির্বাচন ও তার প্রচারে করোনা প্রোটকলের দফারফা হয়ে গেলেও কোন অসুবিধে হলো না। কিন্তু কেরলের মতো দক্ষতা ও যোগ্যতায় মাধ্যমিক পরীক্ষার বন্দোবস্ত করা গেল না। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে। এখন প্রশ্ন হলো কেরল যে কাজটি করে দেখিয়ে দিল। সেই একই কাজ আমাদের রাজ্য সরকার করে দেখাতে পারলো না কেন? উত্তর আগেই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই যে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন উঠে আসছে, তার পিছনের কারণ কি?

অনেকেই বলবেন বামপন্থী রাজনীতি ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ভিতরে মূলগত পার্থক্যই পিছনের আসল কারণ। বিশেষ করে যাঁরা এখনো বাম সমর্থক। শিবির পাল্টান নি এখনো। সেই ৪% ভোটার। এবং যাঁরা প্রকৃতই বামপন্থী। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায়। সেই ৩৪ বছরের বাম শাসনের আমলে করোনা উদয় হলেও মাধ্যমিক পরীক্ষা বন্ধ হতো না এবারের মতো। কেরলে বামপন্থী শিবির ক্ষমতায় না থাকলে কেরলেও নিশ্চয় পরীক্ষা নাও হতে পারতো। কিন্তু সম্ভাবনার কথা এক। আর বাস্তব তথ্য আর এক। তাই সম্ভাবনার কথা থাক। যা ঘটছে তার ভিতরেই আলোচনা সীমিত রাখা ভালো। সোজা কথায় কেরল পেরেছে। বামপন্থী সরকারের আওতায়। পশ্চিমবঙ্গ পারেনি দক্ষিণপন্থী সরকারের আওতায়। এইখানে চলে আসে প্রয়োরিটির প্রশ্ন। সব সরকারের প্রয়োরিটি এক নয়। তাই কেরলের বামপন্থী সরকার যখন শিক্ষার গুরত্বকে করোনার অজুহাতে হালকা করে দেখেনি। ঠিক তখনই আমাদের রাজ্যে করোনার অজুহাতে শিক্ষার গুরুত্বকেই অপশনাল করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা না নিলেও চলবে। কিন্তু সময়মতো উপনির্বাচন করতেই হবে। সাধারণত দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মূল চলটা শিক্ষার প্রসারের বিরুদ্ধে কাজ করতে চায়। কারণ শিক্ষার পরিসর যত সঙ্কুচিত হবে, ক্ষমতার অপব্যবহার তত দীর্ঘায়িত হতে পারে। হবেই যে সেকথা নিশ্চিত ভাবে বলা চলে না। কিন্তু তার সম্ভাবনাটিই বেশি থাকে। অশিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিত কুশিক্ষিত জনসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা যত সহজ। একটা শিক্ষিত জনশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা ততই কঠিন। শিক্ষাই পারে জনসমাজকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে। দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শিবিরগুলি এই কারণেই শিক্ষার প্রসারের বিপ্রতীপে কাজ করতে সচেষ্ট থাকে। তাদের সবচেয়ে বড়ো ভয়। জনসমাজ পাছে জনশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ঠিক এই কারণেই নিয়ে এসেছে নতুন শিক্ষানীতি। এবং জনসমাজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখা তখন আরও সহজ হয়ে যায়, যখন শিক্ষার বিকল্প হিসাবে ধর্মীয় উন্মাদনার শ্রীবৃদ্ধি করা যায়। আমাদের রাজ্যে নতুন বিধানসভার শাসক ও বিরোধী দল এই বিষয়ে একে অপরকে টেক্কা দিতে বিশেষভাবে তৎপর। আর ঠিক এইখানেই করোনা এসেছে আশীর্বাদ স্বরূপ। এমন একটা সুবর্ণ সুযোগ তাই কেন্দ্র ও রাজ্য, দুই সরকারের কেউই হাতছাড়া করতে চায়নি। করেও নি।

রাজ্যের শাসকদলের কোন সমর্থকই এই যুক্তি মানবেন না, ঠিক। কারণ তাঁদের হাতে সবুজসাথী, কন্যাশ্রী, নতুন আনা শিক্ষা বীমা ইত্যাদি ইত্যাদি সব তুরুপের তাস রয়েছে। ফলে রাজ্যের শাসকদলের শিক্ষার প্রসারে কোন উদ্যোগ নেই একথা বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, এই সকল প্রকল্পগুলিই নির্বাচন জেতার কাজে যতটা ফলদায়ক। শিক্ষার প্রসারের কাজে ততটা ফলদায়ক নয়। শিক্ষার উৎকর্ষতা বৃদ্ধির কাজে তো আসেই না। শিক্ষার প্রসার নির্ভর করে উপযুক্ত পরিকাঠামোর উপরেই। বছরের পর বছর স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রেখে আর যাই হোক শিক্ষার প্রসার ঘটানো সম্ভব নয়। না না। আদালতের দোহাই দিলে তো হবে না। আদালতকে নাক গলাতে হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়ার কারণেই। যে দেশে সরকারী শিক্ষকের এপন্টমেয়েন্ট লেটার পেতে গেলে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষই দিতে হয়। সেই দেশে শিক্ষার প্রসার প্রায় কাঁঠালের আমসত্ব বানানোর মতোই বিষয়। টাকার জোরে লবির জোরে শতশত হাজার হাজার অযোগ্য প্রার্থীও শিক্ষক পদে নিয়োগপত্র পেয়ে যেতে পারে। এবং যাবেও। তাদের হাত দিয়ে কি ধরণের শিক্ষিত ছাত্রছাত্রী তৈরী হবে? ফলে গোড়ায় গণ্ডগোল। এবং খেয়াল করলে দেখা যাবে। সেই আগেই যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। জনসমাজকে জনশক্তিতে পরিণত করা থেকে আটকানোর একটাই রাস্তা। শিক্ষার প্রসারের পথকে ক্রমাগত অবরুদ্ধ করে দেওয়া। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে বর্তমান কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকার ঊনিশ-বিশ এই কাজে দুর্দান্ত ভাবে সফল। ফলে মাধ্যমিক পরীক্ষার বন্দোবস্ত না করে সকলকেই পাশ করিয়ে দেওয়া সেই সাফল্যেই শীলমোহর দেওয়ার বন্দোবস্ত আর কি।

২২শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s