সিঙ্গুর সিনড্রম

সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা হলে সিঙ্গুরবাসীর ভাগ্য বদলিয়ে যাবে। এমটাই সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকার ও শাসকদলের পক্ষ থেকে মানুষকে বোঝানো হতো। এবং পরিবর্তনের পরবর্তী দশ বছরে সদ্য নির্বাচিত রাজ্য বিধানসভায় প্রবেশের অধিকার হারানোর পরেও অধিকাংশ বামফ্রন্ট সমর্থকদের আজও বলতে শোনা যায়, সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা হলে সিঙ্গুরবাসীর ভাগ্য বদলিয়ে যেত। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, সিঙ্গুর আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব শ্রী রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য মহাশয়, যিনি সম্প্রতি তৃণমূল ত্যাগ করে ঘাসফুলের বদলে পদ্মফুলের মধু খেতে ছুটেছেন। তিনিও নাকি স্বীকার করেছেন, সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা হলে সিঙ্গুরবাসীরই লাভ হতো। মজার বিষয় হলো এহেন রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্যকেই আজকের অবশিষ্ট বামসমর্থকদের সাক্ষি মানতে হচ্ছে। সিঙ্গুর নিয়ে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত কতটা অভ্রান্ত ছিল প্রমাণ করতে। রাজ্যের বামপন্থীদের মুশকিল হলো তাঁরা ‘জানি শালা ঢুঁ মারবেই’ সিনড্রমের শিকার। সিঙ্গুরে কারখানা গড়ার বিরোধীতা করা মানেই, তাঁদের ধারণায় দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থে রাজ্য থেকে বামফ্রন্টকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রের সমর্থক। না, সত্যিই তাঁদের পক্ষে আজ আর অনুধাবন করা সম্ভব নয়, অনাবাদী এবং একফসলী জমি ফেলে বহুফসলী কৃষিজমি ধ্বংস করে শিল্প গড়ার মানে চুড়ান্ত অবিমিশ্যকারিতা। বাম নেতৃত্ব মুখে যতই বলে এসেছেন, কৃষি আমাদের ভিত, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ। ততবারই তাঁরা ভাবের ঘরে চুরি করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গ একেই একটি অত্যন্ত ছোট রাজ্য। তারপরে সারা ভারতের অবাঙালিদের স্বর্গরাজ্য হওয়ায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ। সেখানে রাজ্যবাসীর খাদ্যে স্বয়ম্ভর থাকার বিষয়টিই প্রাথমিক ভাবে প্রাধান্য পাওয়ার কথা। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য রাজ্যের বহু ফসলী তিন ফসলী দুই ফসলী এমনকি এক ফসলী কৃষিজমির সুরক্ষা নিশ্চিত করাই রাজ্য সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল। সেই দায়িত্ব বাম সরকার তাদের শাসন আমলের প্রথম পর্বে যথেষ্ঠ দক্ষতার সাথে ও সাফল্যের সাথে পালন করেও ছিলেন। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে রাজ্যে শিল্প বাণিজ্যের প্রসারে দিকে নজর দিতে গিয়ে তাঁরা সাধারণজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বা ম্যাকিন্সের মতো পরামর্শদাতা সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁদের ব্রেনওয়াশ করা হয়। ঘটনা যেটাই হোক। শিল্প স্থাপনের প্রাথমিক শর্তকেই তাঁরা অস্বীকার করে বসলেন। পশ্চিমবঙ্গের মতো এতো ক্ষুদ্র এবং জনবহূল একটি কৃষিভিত্তি ভুখণ্ডে শিল্প স্থাপনের প্রাথমিক শর্তটিই তাঁরা ভুলে গেলেন। কৃষিভিত্তিক দেশে শিল্প স্থাপন করতে হলে প্রথমে সকল অনাবাদী জমিগুলি অধিগ্রহণ করে সেখানে শিল্প স্থাপন করে দেখা দরকার, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নণের গতিধারা কাম্য অবস্থানে পৌঁছোয় কিনা। পৌঁছোলে, সেই গতিধারা আরও বেগবান ও সম্প্রসারিত করার প্রয়োজন দেখা দিলে দ্বিতীয় পর্যায়ে একফসলী জমিগুলিও শিল্প স্থাপনের কাজে লাগানোর কথা। ফলে প্রথমে সমস্ত অনাবাদী জমি এবং পরে দরকারে সকল বা অধিকাংশ একফসলী কৃষিজমিও শিল্প স্থাপনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কৃষির যেটুকু ক্ষতি হওয়ার কথা। সেইটুকু শিল্প বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থনৈতিক শক্তিতে বাইরের দেশ থেকে কৃষিজাত পণ্য আমদানী করেও পূরণ করা যায়। তাতে দেশীয় অর্থনীতির উপরে কোন চাপও পড়ার কথা নয়। বরং একটি জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের কাছে এটিই প্রত্যাশীত। হ্যাঁ তারপরেও যদি দেখা যায়। দেশে শিল্পের আরও বেশি সম্প্রসারণ হলে এমন বিপুল অর্থনৈতিক শক্তিবৃদ্ধি ঘটার সম্ভাবনা, যাতে সকল কৃষিজমিও যদি শিল্প বাণিজ্যের কাজে লাগানো হয়। তবুও বর্ধিত অর্থনৈতিক শক্তিতে সকল কৃষিজাত পণ্য বাইরে থেকেই আমদানী করা দেশের অর্থনীতির পক্ষে অধিকতর সুবিধেজনক, একমাত্র তখনই একটি জনকল্যাণকামী সরকার তার বহুফসলী কৃষিজমিতে শিল্প স্থাপনের কথা ভাবতে পারে। তার আগে নয়। না, পশ্চিবঙ্গে শিল্প বাণিজ্যের প্রসারে সকল অনাবাদী ও এক ফসলী দুই ফসলী জমি সাফল্যের সাথে শিল্প স্থাপনের কাজে লাগানোর পরে সিঙ্গুরের বহু ফসলী জমি টাটাদের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল না। একজন বামফ্রন্ট সমর্থকও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যিনি এই গোড়ার গণ্ডগোলটুকু অনুধাবন করতে পারেন। পেরেছেন।

ফলে তাঁরা আজও তাঁদের নেতৃত্বের চুড়ান্ত অবিমিষ্যকারী সিদ্ধান্তের সপেক্ষেই সওয়াল করে যান। আজও তাঁরা সিঙ্গুরের হাজার একর কৃষিজমি ধ্বংসের জন্য অনুতাপ করেন না। উল্টে তাঁদের ধারণায় সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপনের বিরোধীতা করা মানেই শিল্প বাণিজ্যের বিরোধিতা করা। বাম বিরোধী দক্ষিণপন্থী ষড়যন্ত্রের সমর্থন করা। অবশ্যই বাম বিরোধী দক্ষিণপন্থী অপশক্তি সিঙ্গুরের ছিদ্র দিয়েই ঢুকে এমন ভাবেই ফাল হয়ে বেড়িয়েছিল যে, আজ রাজ্য বিধানসভা থেকে বামশক্তি সম্পূর্ণ অপসারিত। ফলে না হোল শিল্প। না থাকলো সিঙ্গুরের বহুফসলী জমি। কিন্তু বামপন্থী থেকে বামসমর্থকদের একথা বোঝার সময় এসেছে। সিঙ্গুরের ছিদ্র বাম নেতৃত্বের হাতেই তৈরী। আর আজ যে শূন্য অবস্থানে পৌঁছানো। তার পিছনেও বাম নেতৃত্বের ব্যর্থতাই দায়ী। দক্ষিণপন্থীদের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকানোর দরকার ছিল। খুঁজে দেখার দরকার ছিল গণ্ডগোলের সূত্রপাতটা কবে কোথায় কিভাবে শুরু হয়েছিল। একটি দল শাসন ক্ষমতা হারালেই নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ভিত আলগা হয়ে যাওয়া মানেই, দলের মতাদর্শগত রাজনৈতিক অবস্থানের দেউলিয়াপনাই প্রমাণিত হয়ে যাওয়া। এই সোজা কথাটি বাম নেতৃত্ব যতদিন না উপলব্ধি করছেন। ততদিন রাজ্যবাসীর অবস্থা জলে কুমীর ডাঙায় বাঘ নিয়ে চলার মতোই থেকে যাবে।

২১শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত   

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s