জনতার রাজনীতি

রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা প্রতিশ্রুতি দেবেন। ভোট পাবেন। ক্ষমতায় গিয়ে পৌঁছাবেন। এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন। জনতা চোখবুঁজে দেখবে। পাঁচ বছর ধরে চোককান বন্ধ করে থাকবে। পরবর্তী নির্বাচনী প্রচারে নেতানেত্রীর রোডশোতে গিয়ে ভিড় করবে। জনসভায় গিয়ে নতুন নতুন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনে আসবে। এবং আরও বেশি সংখ্যায় মিথ্যেবাদী রাজনৈতিক প্রার্থীদের নির্বাচনে জিতিয়ে নিয়ে আসবে। এই যে একটি চক্র। এটাই ভারতের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ায় পাঁচ বছর অন্তর একটি সরকার গড়া হয়। যে সরকার পরিচালনায় তারাই গিয়ে বসেন। যারা বেশি করে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায় করে নিয়ে আসতে পারেন। এবং জনগণ আশা করবে প্রতিটি নতুন সরকার তাদের দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে। নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। আপদে বিপদে জনতার হয়ে কাজ করে চলবে। ফলে ভারতীয় গণতন্ত্রের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে গর্ব অনুভব করবে। এটাই প্রকৃত দেশপ্রেম। যাঁরা এমনতর কোন আশায় আর বিশ্বাসী নয়। তাঁরা নিশ্চিত ভাবেই দেশপ্রেমী নন। তাঁদের ভিতরে যাঁরা আবার সরকারের নানবিধ কাজকর্ম রীতিনীতির সমালোচক। তাঁরাই কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহী। এই যে একটি রাজনৈতিক ন্যারেটিভ। এর ভিতর দিয়েই দেশের আপামর জনসাধরণকে আজ দেখা হচ্ছে। বিচার বিশ্লেষণ করা হচ্ছে কে কেমন। কে কতটা দেশপ্রেমিক। এবং কোথায় কোথায় রাষ্ট্র বিরোধী চক্রান্ত চলছে।

জনগণ এসব কিছুর বিষয়েই ওয়াকিবহাল। জনগণ মাত্রেই জানে, অধিকাংশ সাংসদ বিধায়কই অসাধু। বহু সংখ্যকের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা চলতে থাকে বিভিন্ন আদালতে। কিন্তু জনগণ আর এইসব কিছু দেখে ঠিক করে না, কাকে ভোট দেবে। আর কাকে দেবে না। জনতার ভিতরে যদি অসাধু নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকতো। তবে নিশ্চয়ই তারা বিপুল ভোটে পুনরায় নির্বাচিত হতে পারতো না। জনতা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী মিথ্যাবাদী নেতাদেরকেও ভোটের পর ভোটে জিতিয়ে নিয়ে আসতো না। ফলে একথা নিশ্চিত ভাবেই সত্য। জনতা মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে আহত হয় না। মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধেও তাদরে ভিতরে কোন ক্ষোভবিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে না সেরকম। জনতা আজ জেনে গিয়েছে, রাজনীতি কতটা নীতিহীন এক কর্মকাণ্ড। শুধু ক্ষমতায় থাকা আর অবাধে দেশের সম্পদ লুন্ঠন করাই রাজনীতির প্রধান নীতি। না, জনতাও এর বিপক্ষে নয়। কারণ জনতা জানে। নেতা মন্ত্রীরা দুর্নীতিগ্রস্ত না হলে, নিজের স্বার্থ পুরণে জনতার পক্ষেও দুর্নীতির উপরে ভরসা রাখার উপায় থাকবে না। সেই পুলিশ অফিসারই জনতার নয়নের মণি। যাকে প্রয়োজন মতো ঘুষ দেওয়া যায়। সেই মন্ত্রীই জনতার পক্ষে আশীর্বাদ স্বরূপ। যিনি যত বেশি দুর্নীতির সাথে যুক্ত। আজকের জনতা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ ও রাজনীতির উপাসক। তারা খুব ভালো করে জানে। দুর্নীতি না থাকলে। ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করা শক্ত। অধিকাংশ ব্যক্তিস্বার্থই দুর্নীতির উপরে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। ফলে জনতার দিক থেকে সবসময়ে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সরকারই অধিকতর কাম্য। যেখানে অবাধে দুর্নীতির দৌড়ে অংশ গ্রহণ করা যায়।

ফলে জনতা বেশ ভেবে চিন্তেই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার গড়তে সেই সেই রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষে রায় দিয়ে থাকে। যে যে রাজনৈতিক শিবিরগুলি অধিকতর দুর্নীতির পক্ষ নিয়ে থাকে। এই কারণেই ভারতবর্ষের নির্বাচনী প্রচারে মিথ্যে প্রতিশ্রুতির বন্যা ছোটে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বহরেই জনতা হিসেব করে নিতে পারে কোন দলের পক্ষে কতটা বেশি দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া সম্ভব। সেই হিসেবেই জনতা সরকার নির্বাচিত করে নিয়ে আসে। ফলে সেই নির্বাচিত সরকারও জানে জনতাই তাদের বল ও ভরসা। সেই জনতাকে পাশে রাখতে কিছুটা পরিমাণে দুর্নীতিতে জনতার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলেই নয়। দুর্নীতির একমাত্র অধিকার সরকারের হাতে থাকলেও হবে না। জনতাকেও কিছুটা পরিমাণে ভাগ দিতেই হবে। এই কারণেই সমাজের সকল স্তরে দুর্নীতির প্রসার ও বিকাশে কম বেশি প্রতিটি সরকারই দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করে থাকে। সেই ভুমিকাই পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার প্রধান ফর্মুলা।

১৯শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s