তোতাকাহিনী

আমরা অনেকেই টিভি দেখে কাগজ পড়ে গ্লোবালাইজেশনের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে থাকি। এই এক মন্ত্র জপে আমরা নিজেদেরকে আধুনিক বিশ্বের নাগরিক হিসেবে দেখতে চাই। আর এই বিষয়ে আমাদের হাতে তুরুপের তাস। ঔপনিবেশিক ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা। মিডিয়া প্রচারিত তত্ত্বে ইংরেজিই নাকি গ্লোবালাইজেশনের ভাষা। আর আমাদের ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েরা সেই ভাষাতেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ। আবার এই গ্লোবালাইজেশনকে আমরা প্রতিদিন ইনটারনেটে প্রত্যক্ষও করছি। নিমেষের ভিতর বিশ্বের নানান প্রান্তরের সাথে সংযোগ স্থাপন হয়ে যাচ্ছে নিজের ঘরে বা কর্মক্ষেত্রে বসেই। তারপর রয়েছে অনলাইন শপিং। বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে নেটে ঢুকেই কেনাকাটা সারা যাচ্ছে। ফলে আজ আর আমাদেরকে শুধুমাত্র তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক বলে একপাশে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। আমরাও দিনে দুইবেলা উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের সাথে মোলাকাত করতে পারছি। আদান প্রদান করতে পারছি চিন্তা ভাবনা। আর এইসবই আমাদের কাছে গ্লো‌বালাইজেশনের দান বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘরে ঘরে এই গ্লোবালাইজেশনের নামে আমরা দুইবেলা জয়ধ্বনি দিয়ে থাকি। এই গ্লোবালাইজেশনকে আমরা তাই আশীর্বাদ স্বরূপ মনে করে এর সমর্থনে গলা ফাটিয়েও থাকি বেশ। কেউ যদি এর বিরুদ্ধে দুই একটা কথাও তোলে। সমস্বরে আমরা অনেকেই প্রায় রে রে করে তেড়ে উঠি। আমাদের কাছে কোন আলাদিনের আশ্চর্য্য প্রদীপ নেই। কিন্তু এই এক গালভরা গ্লোবালাইজেশন রয়েছে। আমরা একেই দুইবেলা প্রত্যক্ষ করছি ইনটারনেট থেকে সোশ্যাল সাইটে। নেট ব্যাঙ্কিং থেকে অনলাইন শপিং। জুম থেকে ইউটিউবে। মাল্টিন্যাশানল কোম্পানী থেকে ইন্টারন্যাশানাল প্রোডাক্টে। এই যে সারা বিশ্বকে প্রায় হাতের মুঠোয় পাওয়ার সুযোগ। এটিকেই আমরা সাদরে বরণ করে নিয়েছি। প্রতিদিন বিশ্বের সাথে আমাদের সংযোগ বিস্তৃত হয়ে উঠছে। আমরা আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে পড়ছি গ্লোবালাইজেশনের মোহে।

এই মোহটুকু গ্লোবালাইজেশনের প্রবক্তরাদের হাতে তুরুপের তাস। স্বাভাবিক ভাবেই এই মোহটুকু আবিশ্ব বিস্তার করতে না পারলে গ্লোবালাইজেশনের গল্প বলে গোটা বিশ্বকেই হাতের মুঠোয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো না কোনদিন। এই তত্ত্বের আবিষ্কারকরা এই সত্যটুকু জানতেন একেবারে প্রথম থেকেই। তাই প্রথম থেকেই আটঘাট বেঁধে এই তত্ত্বের প্রচারে এই মোহের বিস্তারের পিছনে তাঁরা অনেক মেহনত করেছেন। তার ফলও ফলেছে হাতেনাতে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকরা চোখকান বন্ধ করে কায়মনোবাক্যে এই তত্ত্বের পিছনে দুই হাত তুলে ছুটতে শুরু করেছি। সেই ছোটা থেকেই মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত প্রচারই আমাদের দুইবেলার গাইডলাইন। সেই প্রচারের ঢক্কানিনাদে আমরা দুইবেলা আপডেটেড হতে থাকি। আর এইভাবে আপডেটেড হতে হতে আমরা খেয়াল করতে পারি না, কবে থেকে আমাদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। আর ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে ওঠার মতোই আমরা মিডিয়ায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েছি। সেই বিশ্বাসের দৃষ্টি দিয়েই আমরা গ্লো‌বালাইজেশনের ণত্ব ষত্ব গুলিকে ধ্রুব এবং অভ্রান্ত বলে ধরে নিতে শুরু করে দিয়েছি। আর মিডিয়া সেই ণত্ব ষত্ব গুলিকে যখন যেমন ভাবে আমাদের সামনে হাজির করছে। যেভাবে ব্যাখ্যা করছে। আমরা তাতেই সন্তুষ্টু হয়ে পড়ছি। আমরা স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে মিডিয়া প্রচারিত ণত্ব ষত্ব গুলিকে নিয়ে কোন রকম প্রশ্ব তুলছি না কখনোই। এই যে, প্রশ্নহীন আনুগত্যে কোন কিছুর ণত্বে ষত্বকে অম্লান বদনে মেনে নেওয়ার দীক্ষা। এই ব্যাপারটিতে আমরা আগে থেকেই অভ্যস্থ ছিলাম। সেই অভ্যাস ক্রিয়াশীল থাকতো আমাদের ধর্ম বিশ্বাস ও ঈশ্বর ভাবনায়। গ্লোবালাইজেশন পর্বে সেই অভ্যাস সম্প্রসারিত হয়েছে মিডিয়া প্রচারিত গ্লোবালাইজেশনের তত্ত্বে। তাই এই তত্ত্বকে আমরা প্রায় প্রশ্নহীন আনুগত্যে মেনে নিয়েছি। আমরা আজ চোখ থাকতেও অন্ধ। কান থাকতেও বধির। শুধু মুখের ব্যবহার করি মুখস্থ শক্তির দক্ষতায়। গ্লোবালাইজেশনের সব থেকে বড়ো সাফল্য এইখানেই। সে আবিশ্ব আমাদেরকে তোতাপাখিতে পরিণত করে দিয়েছে। বিশ্বজুড়েই সেই তোতাকাহিনী শুরু হয়ে গিয়েছে গ্লোবালাইজেশনের নাম করে।

১৬ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s