ধারা ১২৪-এ

ধারা ১২৪-এ। সেই কবে ব্রিটিশ এই আইনটি চালু করেছিল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দমন করতে। কবেই ব্রিটিশ চলে গিয়েছে। সাম্রাজ্য শাসনের ভার দিয়ে গিয়েছে দেশীয় শাসকগোষ্ঠীর হাতে। কায়েম করে গিয়েছে এমন এক গণতন্ত্র। যা দেশীয় শাসক শ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থ সুরক্ষিত রাখে। সেই শ্রেণীস্বার্থ সুরক্ষিত রাখার অন্যতম এক মেকানিজম এই সিডিশন ল। সোজা বাংলায় রাষ্ট্রদ্রোহ আইন। ধারা ১২৪-এ। ১৯৪৭ এর পূর্বে যা ব্রিটিশের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যবহৃত হতো। ১৯৪৭ এর পরবর্তীতে যা দেশীয় শাসকগোষ্ঠীগুলির স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তী আট দশকেও ব্রিটিশের চালু কার এই আইন আজও বাতিল করা হয় নি। কেন বাতিল করা হয় নি? সেই প্রশ্নই তুলেছেন স্বয়ং সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি। কেন বাতিল করা হয় না, সে উত্তর জানে যেকোন সচেতন দেশবাসী। কিন্তু দেশবাসীর কথা শাসকশ্রেণী কানে তোলে না। তোলার কথাও নয়। ভারতবর্ষ একদিন ব্রিটিশ শক্তির লুঠপাটের ক্ষেত্র ছিল। সেই লুঠপাট অবাধে সংঘটিত করার উদ্দেশেই এই ধারা ১২৪-এ চালু করা হয়েছিল। ব্রিটিশ চলে গিয়েছে। কিন্তু অবাধে লুঠপাটের ঐতিহ্য রয়ে গিয়েছে ষোলআনা। লুঠেরাদের পতাকা ও প্রতীক বদলিয়েছে শুধু, দশকে দশকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বিধিকে হাতিয়ার করে। ফলে সরকার এসেছে সরকার গিয়েছে। কিন্তু ধারা ১২৪-এ টিকে রয়েছে বহাল তবিয়তে। শাসনক্ষমতায় পৌঁছালেই এটি একটি মস্ত বড়ো হাতিয়ার। প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলিকে স্তব্ধ করতে। ফলে কোন রাজনৈতিক দলই এই আইনের বিরুদ্ধে কোন গণআন্দোলন সংঘটিত করতে রাজি নয়। সকল দলই জানে একবার শাসনক্ষমতা দখলে এলে এই আইনই তুরুপের তাস হবে। শাসকদল বিরেধী সরকার বিরোধী সকল আন্দোলনের সহজ মোকাবিলায়। ফলে ব্রিটিশের চালু করা এমন একটি হাতিয়ার, কে আর সাধ করে ধ্বংস করতে রাজি হয়? হয়ও নি তাই। বিগত আট দশকের সময়সীমায়।

শাসকদল ও তার পরিচালিত সরকারের কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেই প্রয়োগ করা যেতে পারে এই আইন। সরকার বিরোধী গণআন্দোলনগুলিকে এই আইনের বলে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বানচাল করে দেওয়া সহজ। ফলে যে কোন শাসকদলই চাইবে এই আইনটি সুরক্ষিত রাখতে। এবং সরকার বিরোধী প্রতিবাদগুলি সফল ভাবে প্রতিরোধের উদ্দেশে এই আইনের যথাসম্ভব অপব্যবহার নিশ্চিত করতে। সেই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে দাখিল হয়েছে একাধিক মামলা। মামলাগুলির পরিণতি কি হবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচার কোন পথে এগোবে। রায় কাদের পক্ষে যাবে। সেসব তো পরের কথা। কিন্তু জনসাধারণ কি ভাবছে? তারা কি এই ধারার বিপক্ষে দাঁড়াতে চায়? নাকি, শাসকদলের পক্ষে থেকে তারাও এমন একটি সংবিধান বিরোধী আইনকেই সমর্থন করে যেতে চায়? আসলে খুব কম মানুষই হয়তো ওয়াকিবহাল ধারা ১২৪-এ সংবিধানের ১৯(১)-এ ধারার পরিপন্থী। যে ধারায় নাগরিকের বাকস্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়। সংবিধানের সমানাধিকারের ধারা, ধারা ১৪কেও লঙ্ঘন করে এই সিডিশন ল অর্থাৎ ধারা ১২৪-এ। ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূ্র্ণ ধারা, ধারা ২১। যেখানে প্রতিটি ভারতীয়ের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, সেই ধারাকেও লঙঘন করছে রাষ্ট্রদ্রো‌হ আইনটি। অর্থাৎ ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারকেই লঙ্ঘন করে এই ধারা ১২৪-এ। নাগরিকের বাকস্বাধীনতা। যার পিছনে থাকে স্বাধীন চিন্তাভাবনা করার ও পর্যবেক্ষণ করার মৌলিক অধিকার। প্রতিটি মানুষের সমানাধিকারের মৌলিক অধিকারকেও এই ধারা লঙ্ঘন করছে। এবং প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকারকেও খর্ব করছে এই ধারা। এখন প্রশ্ন, এমন একটি অসাংবিধানিক আইনী ধারা কি করে দশকের পর দশক বহাল রয়েছে। এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের মাহাত্ম। এর উত্তর অবশ্য আমরা আগেই আলোচনা করেছি। কিন্তু সে তো গেল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির শ্রেণীস্বার্থের বিষয়। সাধারণ সচেতন নাগরিক। তাঁরা কেন এই অসাংবিধানিক ধারাটির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সংগঠিত করতে পারেন না? তার আসল কারণ, ভারতীয় গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধ চরিত্রের ভিতরেই বিদ্যমান। এই গণতন্ত্র আসলেই শাসক শ্রেণীর গোষ্ঠীস্বার্থেই আরোপিত। জনগণের স্বার্থে সমাজের ভিতর থেকে বিকশিত নয়। ফলে শাসকশ্রেণীর গোষ্ঠীস্বার্থ সুরক্ষিত রাখতেই এই গণতন্ত্র কাজ করে চলে। জনগণের স্বার্থের সাথে ভারতীয় গণতন্ত্রের কোন সম্পর্কসূত্র আজও গড়ে ওঠেনি। গণতন্ত্র যখন সমাজের অভ্যন্তর থেকে বিকশিত না হয়ে ওঠে। উপর থেকে শাসকশ্রেণীর স্বার্থেই আরোপিত হয়। তখন এমনটাই হওয়ার কথা। ঠিক এই এক কারণেই, রাজনৈতিক দলগুলির স্বার্থের বাইরে জনস্বার্থমুখী কোন গণআন্দোলন সচারচর দানা বাঁধে না এই ভুখণ্ডে। ঠিক এই কারণেই ব্রিটিশের প্রণয়ন করা এই সিডিশন ল ১২৪-এ ধারা’র বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ কোন গণআন্দোলন গড়ে উঠতে পারেনি আজও। আর কোন রাজনৈতিক দলই এই আইনের বিরোধীতা করবে না যে, সে কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি শাসকদলই সরকার গঠনের অধিকার অর্জন করলে কম বেশি এই আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমেই জনস্বার্থ বিরোধী নানাবিধ কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যেতে চায় অবাধে। অবাধে লুঠপাট চলতে থাকে দেশের সম্পদের উপর। আর যাঁরা যাঁরা সেই লুঠপাট ও নানবিধ জনস্বার্থ বিরোধী আইন ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাঁদের কন্ঠরোধ করতেই শেষ অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই সিডিশন ল’ ধারা ১২৪-এ। এখন প্রশ্ন একটিই এর বিরুদ্ধে বৃহৎ একটি জনমত গড়ে উঠবে কিনা। সুপ্রীম কোর্ট আদৌ সংবিধান বিরোধী এমন একটি আইনকে বাতিল ঘো‌ষণা করবেন কিনা।

১৫ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s