প্রতিবিম্ব

আমাদের বাংলা প্রবাদে বলে, চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরে। কেন? চুরি বিদ্যা ধরা পড়ুক আর নাই পড়ুক নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য একটি অপরাধ নিশ্চয়। তাহলে সেই অপরাধকেও মহাবিদ্যা বলা হচ্ছে কেন? না, হচ্ছে যদি ধরা না পড়ে যায়। অর্থাৎ এর থেকে আমরা দুইটি বিষয় বুঝে নিতে পারি। এক, চুরি করতে গেলে সাহস এবং বুদ্ধি দুই লাগে। কাজ খারাপ হোক আর যাই হো‌ক এই দুই বিদ্যায় পারদর্শী না হলে চুরি করা সম্ভব নয়। এবং চুরি করেও ধরা না পড়ার বিষয়টি আরও বড়ো বিদ্যা অর্থাৎ মহাবিদ্যা। সে’ মানুষের পকেট কাটাই হোক। আর জনগণের গলাই কাটা হোক। মহাবিদ্যা তো অবশ্যই। অর্থাৎ সেই বিদ্যাকে স্বীকৃতি দান। আর দুই, বাঙালির কাছে চুরি বিদ্যা জীবনযাপনের পরতে পরতে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিশ্চয়। না হলে এমন একটি প্রবাদের প্রচলন হতো কি? অবশ্য শুধু বাঙালিই বা কেন। ভারতবর্ষের অধিকাংশ জাতিসহ গোটা উপমহাদেশেই চুরিচামারি করা একটি স্বাভাবিক সামাজিক ক্রিয়া। ধরা না পড়লেই সাত খুন মাফ। কিন্তু মুশকিল হয়, ধরা পড়ে গেলেই। তখন সেই একই সমাজ, যে সমাজ চুরিচামারিকে একটি স্বাভাবিক মানব প্রবৃত্তি হিসাবে দেখে। সেই সমাজই চোরের শাস্তি বিধানে উঠে পড়ে লাগে। এবং লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যে যত বড়ো চোর, সেই যেন তত বেশি করে ধরা পড়ে যাওয়া চোরের শাস্তি বিধানের জন্য উঠে পড়ে লাগে। বাংলার সমাজ ইতিহাসে চুরি করার মতো মহাবিদ্যা নিয়ে কোন গবেষণা আজ অব্দি হয়েছে কিনা, জানা যায় না। কিন্তু হলে বাঙালির অন্তরগঠনের এবং সমাজবাস্তবতার একটি প্রামাণ্য চিত্র পাওয়া যেত নিশ্চয়। ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা’র পাশাপাশি আরও একটি প্রবাদ স্মরণ করা যেতে পারে। কারণ সেটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলার সমাজবাস্তবতায়। সেটি হলো ‘ঠগ বাছতে গাঁ উজার’। অর্থাৎ একটু আগেই আমরা বাংলার সমাজবাস্তবতায় চুরিচামারি যে জীবনযাপনেরই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছি, সেই কথাকে প্রমাণ করতেই এই ‘ঠগ বাছতে গাঁ উজার’ প্রবাদটির প্রচলন হয়েছে। অর্থাৎ সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন কে ঠগ আর কে নয়! একটা সমাজে যখন এমন একটি ভয়াবহ প্রবাদের জন্ম হয়। তখন বুঝতে হবে, সমাজের খোলনলচের সর্বত্র দুনম্বরী ছেয়ে আছে। আর যে কোন প্রবাদ যেহেতু এক দিনে জন্ম নেয় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী সময়ব্যাপী জীবনচর্চার ধারায় গড়ে ওঠে। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, বঙ্গ সমাজে দুর্নীতি আধুনিক কালের কোন রোগ নয়। বস্তুত এই রোগের ভিতর দিয়ে বিবর্তিত হতে হতেই আজকের বঙ্গসমাজ এই অবস্থায় এসে পৌঁছিয়েছে।

ফলে দেখা যাচ্ছে চুরি ও লোক ঠকানো বিষয় দুইটিই খুব সুপ্রাচীন। আর প্রধানত এই দুইটি বিদ্যার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে দুর্নীতির সংস্কৃতি। একটু ইতিহাসের দিকে মুখ ফেরালে আমরা দেখতে পাই, শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় এক মাৎস্যন্যায় দেখা দিয়েছিল। বেশ কয়েক শতাব্দী সেই অবস্থায় কাটানোর পর। বিশ্বে প্রথম নির্বাচিত শাসক গোপাল দেশ শাসনের ভার গ্রহণ করেন। সূচনা হয় পাল বংশের। ফলে বাংলায় দুর্নীতির ইতিহাস অত্যন্ত সুপ্রাচীন। শশাঙ্কের অব্যবহিত পর দক্ষ শাসকের অভাবে সেই দুর্নীতি এমনভাবেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল যে। কয়েক শতক মাৎস্যন্যায় চলতে থাকে। ফলে দক্ষ শাসক থাকা আর না থাকার উপরে সামাজিক স্থিতি অনেকটাই নির্ভর করে। শাসকের দক্ষতায় সমাজদেহের অভ্যন্তরস্থ রোগের লক্ষ্মণগুলি হয়তো ততটা প্রকট হয়ে দেখা দেয় না। যতটা দেখা দেয় দুর্বল শাসন ব্যবস্থায়। সেই সূত্রে একথা হয়তো নিশ্চয় বলা যেতে পারে। সমাজে চুরিজোচ্চুরি ঠগবাজি তখনই বেশি বৃদ্ধি পায়, অদক্ষ প্রশাসন যখন শাসনভার হাতে পেয়ে যায়। আর ভারতীয় উপমহাদেশে তো সর্ষের ভিতরেই ভুত থাকে। ফলে প্রশাসন অদক্ষ না দক্ষ সেটিও ততটা প্রাসঙ্গিক থাকে না। যতটা না প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে চোর জোচ্চর ঠগবাজদেরই প্রশাসনে পৌঁছিয়ে যাওয়া। আর সেই পৌঁছিয়ে যাওয়ার পথটাই এদেশে ব্রিটিশের প্রবর্তিত গণতন্ত্র। আমাদের দেশে গণতন্ত্র ইউরোপের মতো সামাজিক বিবর্তনের পথে সমাজদেহের অন্তর থেকে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। এখানে গণতন্ত্রকে আমদানী করে রোপন করা হয়েছে মাত্র। ফলে আমাদের সমাজের ঠক জোচ্চর বাটপাররাই যে প্রধানত সেই গণতন্ত্রের মধু খেতে প্রশাসনে পৌঁছিয়ে যাবে সকলের আগে, এ আর বিচিত্র কি? বরং আমাদের সমাজের যা ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। তাতে উল্টোপুরাণ হলেই সেটি হতো অস্বাভাবিক। ফলে রাজ্যজুড়ে সম্প্রতি প্রতারকদের ধরা পড়া দেখে যাঁরা মাথায় হাত দিচ্ছেন। তাঁদের সকলের আগে একবার মুখ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটি দেখে নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত, ঠগ বাছতে গাঁ উজার প্রবাদটি তাঁর নিজের জীবন ও কর্ম, সাধ ও সাধনার বিপ্রতীপেই অবস্থান করে তো? বংশকৌলিন্য যাই হোক। তাঁর আজকের অবস্থান প্রবাদের পরিসের বাইরে থাকলেই মুখরক্ষা অন্তত!

১৪ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s