জরুরী অবস্থা

সরকারের সমালোচনা করা আর দেশবিরোধী চক্রান্ত করা সমার্থক হয়ে গেলে গণতন্ত্রই বিপন্ন হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার যতই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় আসীন হোক না কেন, সরকারেরে প্রণীত আইন গৃহীত নীতিমালা এবং কর্মপ্রণালী সবসময় প্রশ্নের উর্ধে থাকবে এমনটা নাও হতে পারে। সরকারের আইন নীতিমালা এবং কর্মপ্রণালী সব সময় দেশহিতের পক্ষে উপযুক্তই হবে এমন নিশ্চয়তা কেউই দিতে পারে না। বরং অনেক সময়েই দেখা যায় সেইগুলি দেশ সমাজ ও দেশবাসীর পক্ষে বিপদজনক এবং সমূহ ক্ষতিসাধক হয়েও উঠতে পারে। ফলে সেই সময় সরকার প্রণীত আইন গৃহীত নীতিমালা কিংবা কর্মপ্রণালী নিয়ে আলোচনা সমালোচনার পরিসর থাকা অত্যন্ত জরুরী। সেই পরিসর সংকীর্ণ হয়ে এলে সমগ্র দেশের জন্যেই তা এক অশনিসংকেত স্বরূপ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা আলোচনার উন্মুক্ত পরিসর থাকা অত্যন্ত জরুরী। এবং সেই পরিসর যত বেশি বিস্তৃত থাকে ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে সেই দেশের গণতন্ত্র। ততই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে সেই দেশের সার্বিক অবস্থা। একটি সরকার কতটা গণতান্ত্রিক সেটি বোঝা যায়, সেই সরকার কতটা বিরুদ্ধ সমালোচনাকে সদর্থক ভাবে গ্রহণ করতে পারে, এবং দরকারে সেই বিরুদ্ধ সমালোচনার উৎস খুঁজে নিয়ে নিজের ভুল নীতির দ্রুত সংশোধন করে নিতে পারে। না, ঠিক এমন একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক সরকার সচারচর দেখা যায় না। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে। অধিকাংশ গণতান্ত্রিক সরকারেরই খুঁটি বাঁধা থাকে দেশের শিল্পমহলের স্বার্থের কাছে। সেই স্বার্থ পূরণ করতেই রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এবং সেই স্বার্থ পুরণের সমান্তরালে রাজনৈতিক দলগুলি লাগামছাড়া দুর্নীতি‌তে অংশগ্রহণ করে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেই। আর সেই অপকর্ম ঢাকার উদ্দেশেই সরকার তার প্রণীত আইন গৃহীত নীতিমালা এবং তার শাসন প্রণালীর কোনরকম বিরুদ্ধ সমালোচনা বরদাস্ত করতে রাজি হয় না। চেষ্টা করে প্রবল ভাবে বিরুদ্ধ সমালোচনার কন্ঠরোধ করতে। সরকার বিরোধী সমালোচনাকে এই কারণেই সময় সময় দেশবিরোধী রাষ্ট্রদ্রোহের চক্রান্ত বলে দেগে দিতে উদ্যত হয়ে ওঠে শাসকশ্রেণী। যেহেতু শাসকশ্রেণীর হাতেই সব ক্ষমতা। ফলে প্রয়োজনে আইনকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরকার বিরোধী কন্ঠস্বরকে দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। আর দাবিয়ে দিতে না পারলেই শুরু হয়ে যায় দমন পীড়ন। মানবাধিকার লঙ্ঘণ ইত্যাদি।

বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থা অনেকটাই এইরকম এক পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে চলছে। সরকার বিরোধী যে কোন সমালোচনাকেই ভারত বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করা হচ্ছে নিরন্তর। নিরন্তর প্রচারে সরকার আর ভারতবর্ষকে সমার্থক করে ফেলা হচ্ছে। মানুষের মনের ভিতরে একটা ধারণাই গেঁথে দেওয়া হচ্ছে, সরকারের সমালোচনা করা মানেই দেশ বিরোধী চক্রান্ত করতে থাকা। মানুষের ভিতরে আরও একটি ধারণা গেঁথে দেওয়ার কাজ চলছে সুনিপুণ ভাবে। সেটি হলো, সরকার যত শক্তিশালী থাকবে। দেশও তত উন্নত হয়ে উঠবে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে সরকারের পক্ষে থেকে সরকারের সব ধরণের কাজের প্রতি সমর্থন জুগিয়ে যাওয়াই দেশপ্রেমের নিদর্শন বলে মনে হতে থাকবে। এবং সেইটিই হচ্ছে একটা বড়ো অংশের দেশবাসীর মনের ভিতরে। তাঁরাও প্রকৃত দেশপ্রেমী। কিন্তু সরকারের প্রতি অন্ধভক্তি বশত তাঁদের চোখ বন্ধ আজ। তাই চোখ থাকতেও দেশের সর্বনাশ সম্বন্ধে তাঁদের কোন স্পষ্ট ধারণা হচ্ছে না। দেশের আসল শত্রু কে। দেশের আসল মিত্র কে, সেই কথা অনুধাবনের শক্তি তাঁদের ভিতরে না থাকার কারণেই তাঁরা সরকারের সকল অপকর্মেরও সমর্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অন্ধ বিশ্বাসীদের বাইরে, যাঁদের এখনো চোখ খোলা। যাঁরা কত ধানে কত চাল টের পাচ্ছেন নিরন্তর। তাঁরা যখন সরকার বিরোধী সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। গোল বাঁধে তখনই। সরকারের সবসময় একটা ভয় থাকে। দেশের অধিকাংশ মানুষের চোখ খুলে গেলেই সর্বনাশ। তাহলেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গদি হারিয়ে ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে বেশি। ঠিক এই ভয় থেকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি প্রথম থেকেই সদা সতর্ক থাকে। যেখানেই সরকারের প্রণীত আইন গৃহীত নীতিমালা ও কর্মপ্রণালী নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেখানেই কঠোর ভাবে কন্ঠরোধ করা শুরু হয়ে যায়। আর সেই কাজে নানাবিধ উপায় থাকলেও শেষ উপায় ও ব্রহ্মাস্ত্র হলো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহের চক্রান্তের অভিযোগে বিরুদ্ধ কন্ঠস্বরগুলিকে বিনা বিচারে আটক করে রাখা দিনের পর দিন। এই কাজে ভারতবর্ষের বর্তমান সরকার বিপুল সাফল্যের দাবি করতেই পারে। দেশের অধিকাংশ মানুষকেই অন্ধ বিশ্বাসী করে রাখার বিষয়ে তাদের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডই যেমন সফল। তেমনই সরকার বিরোধী যাবতীয় কন্ঠস্বরকে গারদের ভিতরে আটকিয়ে রাখার কাজেও তাদের সাফল্য সত্যই ঈর্ষনীয়। ফলে ভয়ে এবং ভক্তিতে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনমত দানা বাঁধতে পারছেনা কিছুতেই। সেই কারণে ব্যক্তি মানুষের জীবন যতই দুর্বিষহ হয়ে যাক না কেন। মানুষ এখনো অন্ধকারেই হাতরাচ্ছে।

১৩ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s