৪২ শতাংশের জনসমর্থন

তিনি বলেছিলেন। জনগণ তাঁকে ক্ষমতায় বসালে তিনি ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত বিচারাধীন সাংসদ বিধায়ক থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত সদস্য পর্য্যন্ত সকল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিচার দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। যাতে কোন প্রকৃত অপরাধী জনপ্রতিনিধির আসন দখল করে না রাখতে পারেন। এমনকি তিনি এমনও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি দেশপ্রধান হলে ফৌজদারী মামলার অভিধুক্ত কাউকেই যাতে কোন দল নির্বাচনে দাঁড়ানোর টিকিট না দেয় সেটা তিনি দেখবেন। সেই ব্যক্তি যদি তাঁর নিজ দলেরও কেউ হন। অর্থাৎ সেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে, সুইস ব্যাংক থেকে সব কালো টাকা উদ্ধার করে প্রত্যেক ভারতীয়ের ব্যাংক একাউন্টে মাথা পিছু ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মতো তাঁর এই প্রতিশ্রুতিতেও জনগণ বিশ্বাস করে তাঁকে বিপুল ভোটে নির্বাচনে জয়ী করেছিল। এবং ফল ফলেছিল হাতেনাতে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত সাংসদদের ভিতর বিভিন্ন ফৌজদারী মামলায় বিচারাধীন অভিযুক্ত সাংসদদের সংখ্যা ছিল ৩৫%। আর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই সংখ্যা ৪২% হয়ে দাঁড়ায়। এঁদের ভিতর ১১৬ জনই কিন্তু হলেন শাসকদলের সদস্য। যাঁরা শাসকদলের আনা কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯, তিন কৃষি আইন, নতুন শ্রম আইন ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল। গণতান্ত্রিক ভারতের মুখ উজ্জ্বল করার মতো এই ইতিহাস আগামী বহু দশক ভারতবর্ষকে পথ দেখাবে সন্দেহ নাই। সেই তিনি সম্প্রতি তাঁর মন্ত্রীসভা সম্প্রসারিত করলেন। করলেন বেশ অভিনব হিসাবেই। এসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মের প্রকাশ করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে তাঁর নতুন মন্ত্রীসভার ৭৮ জন সদস্যের ভিতর ৩৩ জন সদস্যই গুরুতর ফৌজদারী মামলা থেকে শুরু করে নানবিধ ফৌজদারী মামলায় বিচারাধীন এখনো। ফলে ভারতবর্ষের কেন্দ্র সরকারের বর্তমান মন্ত্রীসভার ৪২% সদস্যই ফৌজদারী মামলার আসামী। যাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ক্রিমিন্যাল কেস ঝুলে রয়েছে। স্বভাবতই সেই মামলাগুলিকে আরও দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হবে। সামনের নির্বাচন পেড়িয়ে যাওয়া অব্দি তো বটেই। অর্থাৎ বর্তমান লোকসভায় মোট সদস্যদের ভিতর যেমন ৪২% সদস্য বিচারাধীন ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত। ঠিক তেমনই বর্তমান মন্ত্রীসভায় ৪২% মন্ত্রীই নানান ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত এখনো। অর্থাৎ বিয়াল্লিশে বিয়াল্লিশ!

একই সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে জানা যাচ্ছে ৭৮ জনের মন্ত্রীসভার ৯০% সদস্যেরই সম্পত্তির পরিমান এক কোটি টাকার উর্ধে। এবং মন্ত্রীদের গড় সম্পত্তির পরিমান ষোল কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ মন্ত্রীসভার প্রায় প্রত্যেকেই বিপুল ধনসম্পদের মালিক। এই ধনপতিদেরই ৪২% ক্রিমিন্যাল কেসগুলিতে অভিযুক্ত। ফলে ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের প্রকৃত মুখ আজ আর অস্পষ্ট নয়। এখন দেখার বিষয় এই যে ৪২% সাংসদ। যাঁরা বিভিন্ন ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত। তাঁদের তো জনগণই নির্বাচিত করে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। নিশ্চয় জনগণের বিশ্বাস এইসকল অভিযুক্তদেরকে আইনসভায় পাঠালে দেশের সার্বিক উন্নতি নিশ্চিত হবে। কারণ সেখানেই গণতন্ত্রের তাৎপর্য! জনগণই রাষ্ট্রের সরকার নির্বাচিত করবে, জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে। এখন কোন শ্রেণীর জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। সেটি নির্ভর করবে জনমানসের চাহিদা ও প্রয়োজনের উপরেই। এমনটাই তো প্রত্যাশিত। ভারতবর্ষের প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি লোকসভায় পূর্ববর্তী লোকসভা থেকে অধিকতর সংখ্যায় ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত ব্যক্তিই আইনসভায় জনপ্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এটা নিশ্চয় একটা অগ্রগতি! এই অগ্রগতিই ভারতবর্ষের বর্তমান রাজনীতির অভিমুখ এবং প্রকৃতি স্থির করে দিচ্ছে। ফলে একথা অনস্বীকার্য। ভারতীয় জনতার একটি বড়ো অংশ দুর্নীতির স্বপক্ষে বিদ্যমান। যেখানে দুর্নীতি। সেখানেই তাঁদের বিপুল জনসমর্থন। কেননা জনসমর্থন ছাড়া দেশের আইনসভায় এই বিয়াল্লিশ শতাংশ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারে না। সেই জনসমর্থনকেই মান্যতা দিতে দেশপ্রধান তাঁর সম্প্রসারিত মন্ত্রীসভায় এমন বিয়াল্লিশ শতাংশ অভিযুক্তদের ঠাঁই দিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারী মামলাসহ একাধিক মামলা চলছে।

বছরের পর বছর সেই মামলা গুলি ঝুলে থাকবে। অভিযুক্ত মন্ত্রী ও সাংসদরা তাদের রাজনৈতিক ও সরকারী প্রভাব ও প্রতিপত্তি খাটিয়ে এবং ধনসম্পদের বলে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অধিকাংশ অভিযোগই খণ্ডনে প্রয়াসী হবেন। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হবেন সন্দেহ নাই। জনগণের আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে ভারতবর্ষে আইনের উর্ধে বিরাজমান থাকা খুব একটা কঠিন কাজও নয়। খুব একটা অস্বাভাবিক বিষয়ও নয়। রাজনীতির পাটিগণিত ও নির্বাচনের হিসাব নিকাশ সব পাপ ধুয়ে দিতে প্রস্তুত। কেননা দিনের শেষে, দেশের জনগণ এবং তাঁদের জনসমর্থন পাশে না থাকলে একটা মন্ত্রীসভায় বিয়াল্লিশ শতাংশ বিচারাধীন অভিযুক্তকে ঠাঁই দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই জনসমর্থনই এদেশের রাজনীতির নির্ণায়ক শক্তি। সেই জনসমর্থন পাশে থাকলে ৪২% কেন, একদিন গোটা মন্ত্রীসভাই দাগী অভিযুক্তদের নিয়ে গঠিত হতে কোন বাধা থাকবে না। সেদিন হয়তো বা আর বেশি দূরেও নেই।

১১ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s