এন পি আর

এনপিআর অর্থাৎ ন্যাশানাল পপুলেশন রেজিস্টার। বাজেট বরাদ্দ হয়েছে আট হাজার পাঁচশ কোটি টাকা। এই টাকা শুধু মাত্র খরচ হবে দেশে বসবাসকারী মানুষের তথ্য ভাণ্ডার তৈরী করতে। না এমন নয়, সরকারের কাছে এই তথ্য ভাণ্ডার নাই। আছে। দশ বছর আগেই করা হয়েছিল প্রথম এনপিআর। দশ বছর অন্তর এই তথ্য ভাণ্ডার নবীন করণ করার নিয়ম। নিয়মটি করা হয়েছিল ২০০৩ সালের করা নাগরিক সংশোধনী আইনের নির্দেশ অনুসারে। সম্পূর্ণ অনুৎপাদক একটি খরচ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশবাসীর কাঁধে। দেশে প্রতি দশ বছর আদমসুমারী হয়। দেশের নির্বাচন কমিশনের কাছে সারা দেশের ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকদের তথ্য ভাণ্ডার রয়েছে। রয়েছে আধার কার্ডে ধারণ করা প্রত্যেক নাগরিকের বিস্তৃত তথ্যও। তারপরেও আবার এনপিআর। এনপিআর হচ্ছে এনআরসি করার প্রথম ধাপ। কংগ্রেস দলের প্রকাশিত বিবৃতি অনুসারে, ২০১০ সালে কংগ্রেস সরকার প্রথম এনপিআর করে বুঝতে পারে, ভারতবর্ষের মতো দেশে পরের ধাপ এনআরসি তৈরী করা খুবই জটিল একটি বিষয়। তাই তারা এনপিআর করেই থেমে গিয়েছিল। কিন্তু সরকার আসে। সরকার যায়। নতুন সরকার তার নতুন এজেণ্ডা অনুসারে কাজ শুরু করে দেয়। আর ঠিক সেই কারণেই এবার যে এনপিআর করার জন্য ৮৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, তাতে যে সকল তথ্য আগের বারে নেওয়া হয়েছিল, তার সাথে আরও সাতটি নতুন তথ্য এবারে নেওয়া হবে। এবারে শুধু নিজের জন্ম তারিখ ও জন্মস্থান জানালেই হবে না। জানাতে হবে নিজের পিতামাতার জন্ম তারিখ ও জন্মস্থানের নামও। সাথে মোবাইল নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, আধার নম্বর, ইত্যাদি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য।

এই যে পিতামাতার জন্মস্থান ও তারিখ চাওয়া হবে, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। কারণটি হলো ২০০৩ সালের পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বদল ঘটানো হয়। পূর্বে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার বিভিন্ন শর্তের ভিতর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত ছিল, পিতা বা মাতার যে কোন একজন ভারতীয় নাগরিক হলেই তাদের সন্তান ভারতীয় নাগরিক হতে পারবে। কিন্তু ২০০৩ এর সংশোধনীতে বলা হয়, পিতামাতার দুজনকেই ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। না হলে তাদের সন্তান ভারতীয় নাগরিক বলে গন্য হবে না। ফলে ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইন অনুসারে সকল নাগরিকই আর ২০০৩ সালের সংশোধিত নাগরিক আইনে ভারতের নাগরিক থাকছে না। মূল বিষয়টি এইখানেই। এবারের এনপিআরে ঠিক এই কারণেই প্রত্যেকের পিতামাতার জন্মস্থান ও তারিখ জানতে চাওয়া হবে।

২০০৩ সালের নাগরিক সংশোধনী আইনের আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই, বলা হয়েছে যে, ১৯৪৮ সালের ১৯শে জুলাই রাত্রি ১২টার পরে ভারতে আসা যে সকল ব্যক্তি সরাষ্ট্র দপ্তরে আবেদন করে ভারতীয় নাগরিকত্ব নেন নি, তার সকলেই এদেশে অনুপ্রবেশকারী। অর্থাৎ এবারের এনপিআর করার মূল উদ্দেশ্য হলে, প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হবে, কাদের বাবা মা দুজনেই বা একজন আজকের পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে জন্মেছিলেন। এবং তাদেরকেই ২০০৩ সালের নাগরিক সংশোধনী আইনের বলে চিহ্নিত করা হবে। চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে পৃথক একটি তালিকা তৈরী হবে। যাদের তালিকা সম্ভবত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। এই তালিকা অনুসারেই বাড়ি বাড়ি নোটিশ পাঠানো হবে, নাগরিকত্ব প্রমাণের নির্দেশ দিয়ে। তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ স্বরূপ সত্তর আশি বছর আগেকার সরকারী বৈধ নথিপত্র দাখিল করতে হবে সরকারের কাছে। আসামে অনেকটা এইরকমই হয়েছিল বলে খবরে প্রকাশ। প্রথমে ডাউটফুল ভোটারের তালিকা প্রস্তুত করে, প্রত্যেকের কাছে ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চের আগে থেকে আসামে বসবাসের সরকারী নথি দেখাতে বলা হয়েছিল। আসামে যেটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ রাত্রি ১২টা, সারা ভারতের ক্ষেত্রে সেটিই ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই রাত্রি ১২টা বলে ধার্য্য হয়েছে ২০০৩ সালে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে।

অর্থাৎ যাঁরা এনআরসি’র বিরোধীতায় ব্যস্ত। তাদের চোখকে কার্যত ফাঁকি দিয়ে এনআরসি’র আসল কাজটাই এই এনপিআর-এর মাধ্যমে শুরু করে দিতে চায় সরকার। এনপিআর-এর সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত হয়ে গেলেই সরকারের কাছে কারা ২০০৩ সালের সংশোধিত নাগরিক আইন অনুযায়ী অনুপ্রবেশকারী তার তথ্য ভাণ্ডার চলে আসবে। এখানে দেখার বিষয় এইটাই যে, ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইন অনুসারে সকল ভারতীয় নাগরিকই কিন্তু আর ২০০৩ সালের সংশোধিত নাগরিক আইনে ভারতীয় নাগরিক থাকছেন না। কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে, সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে পিতামাতা দুজনকেই ভারতের বৈধ নাগরিক হতে হবে। আবার বৈধ নাগরিক হলেই হবে না। থাকতে হবে সত্তর আশি বছর আগেকার সরকারী বৈধ নথিপত্র। অনেক বৈধ নাগরিকই এত পুরানো কাগজপত্তর সংরক্ষণের অভাবে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন। ঠিক যেমনটি হয়েছে আসামে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইনে যিনি বৈধ ভারতীয় নাগরিক, তিনিও ২০০৩ সালের সংশোধিত নাগরিক আইনে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন। এবারের এনপিআর আসলে ১৯৫৫ সালের আইন মোতাবেক বৈধ নাগরিকের এক অংশকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করার এক সুবৃহৎ যজ্ঞ।

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s