ঠগ বাছতে গাঁ উজার

সংবাদ শিরোনামে পশ্চিমবঙ্গ। সৌজন্যে জালিয়াতদের জালিয়াতির পেশা। হ্যাঁ, এটিও একটি পেশা। এবং ভালোমতো আয়। জালিয়াতি আর ভণ্ডামির ভিতর কতটুকু পার্থক্য? গবেষণার বিষয় হতে পারে অবশ্য। তবে নির্বাচনে জিতলে সুইস ব্যাংকের সব কালোটাকা উদ্ধার করে প্রত্যেক ভারতীয়ের ব্যাংক একাউন্টে পনেরো লাখ করে টাকা দেওয়ার নির্বাচনী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি অবশ্য ভণ্ডামি নয়, কারণ মিডিয়া তেমন কথা বলে না। তবে বেকার যুবক যুবতীদেরকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া কিন্তু ভণ্ডামি। দেশের চৌকিদার সেজে সরকারী সম্পত্তি বিশেষ কয়েকজনকে জলের দরে বেচে দেওয়া কিন্তু জালিয়াতি নয়্ কারণ মিডিয়া তেমনটা বলে না। তবে ভুয়ো আইপিএস সেজে ভুয়ো ভ্যাক্সিন দেওয়া কিন্তু জালিয়াতি। কারণ মিডিয়া তেমনটাই বলতে থাকে। ফলে আমরা আমজনতা, ভুয়ো চৌকিদার ছেড়ে ভুয়ো আইপিএসদের পিছনে পড়ে থাকি। এবং এইভাবে একটা চোখ বন্ধ করে অন্য চোখ হিসেব কষে ব্যবহার করতে করতে আমরা ভুলেই যাই। দেশটা কিন্তু আসলেই আমাদের ছিল। না, আজ আর তা নাই। কারণ আমরা বেছেবুছে যখন যেমন যাদের যাদের হাতে দেশটাকে বিসর্জন দিয়ে থাকি, তারা তখন তখন তেমন করে তাদের কাজে এক মিনিটও সময় নষ্ট করেন না। ফলে কাজ কিন্তু চলতে থাকে দ্রুত গতিতে। আর সেই ফাঁকে আমাদের চারপাশটা ভরে যেতে থাকে জা‌লিয়াতে। ভুয়ো ডাক্তার। ভুয়ো শিক্ষক। ভুয়ো আধিকারিক। ভুয়ো উকিল। ভুয়ো নেতা। ভুয়ো পুলিশ। ভুয়ো সমাজসেবক। ভুয়ো দেশসেবক। শুধু আজ অব্দি ভুয়ো ক্রিমিনালের কোন সংবাদ পাওয়া যায় নি অবশ্য।

এখন এই ভুয়ো লোকগুলি যে জালিয়াতির পেশায় দিনে দিনে উন্নতি করতে থাকে। তার একটা বড়ো কারণ কিন্তু এঁদের সাথে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠতা। এবং সেই সূত্রে ক্ষমতার অলিন্দে তাদের অবাধ গতি। তাই লালবাতি নীলবাতি জ্বালিয়ে তারা নিশ্চিন্তে মানুষের হাড় জ্বালাতে পারে। আর তাদের ভিতর যারা আরও একটু উঁচুদরের শিল্পী। তারা কোন কোন রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা ধরে একবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলেই সেমিফাইনাল জেতা নিশ্চিত। আর যেভাবেই হোক, একবার নির্বাচনে জিতে গেলে একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা রূপে ফাইনাল প্রোডাক্ট হয়ে বেড়োনো। সার্থক মেড ইন ইন্ডিয়া প্রোডাকশন। তবে নির্বাচন জেতার প্রক্রিয়ায় বুথ জ্যাম, ছাপ্পা ভোট, ইভিএম হ্যাক থেকে শুরু করে রাস্তায় উন্নয়নকে দাঁড় করিয়ে রাখা কিংবা পুলওয়ামা বালাকোট অব্দি কোনটিই কিন্তু জালিয়াতির পর্যায় পড়ে না। এগুলি নির্বাচনী প্রকৌশল মাত্র। শিল্পী যেমন তার ক্যানভাসে তুলির সূক্ষ টানে তার ছবিকে জীবন্ত করে তোলেন। এও তেমনই। ক্ষমতার অতি সূক্ষ্ম কারিকুরিতে গণতন্ত্রকে জীবন্ত করে তোলা। ফলে সেই গণতন্ত্রের ছত্রছায়াতেই সুদীপ্ত সেন দেবাঞ্জন সনাতনরা জমি তৈরী করতে থাকে। এও এক চক্রব্যূহ। রাজনীতি গণতন্ত্র প্রশাসন ক্ষমতাতন্ত্র জালিয়াতি বা ভণ্ডামি সব এই এক চক্রের ভিতরেই ঘুরপাক খেতে থাকে।

যার শিকার কিন্তু আমি আপনি। আমরা। আমরা ভোটার রূপে, নাগরিক রূপে, দেশবাসী রূপে সর্বত্র এই জালিয়াত চক্রের হাতে নাচতে থাকি। তাদের স্বার্থ আর লোভের কারণে। আমাদের নৃত্য যত দ্রুতলয়ে চলতে থাকবে। তারাও তত দ্রুত সমাজ ও দেশের কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠতে থাকবে। অথবা উল্টো দিক দিয়ে দেখলে, তাদের লোভ ও স্বার্থের পারদ যত চড়তে থাকবে। ততই তাদের হাতে আমাদের নৃত্য দ্রুতলয়ে চলতে থাকবে। এই যেমন, এই সময়ের নির্ঘন্টে একশো টাকার পেট্রোল পুড়িয়ে বাজারে গিয়ে দুইশো টাকার সর্ষের তেল কিনে এনে বাড়িতে প্রায় নয়শো টাকার গ্যাস সিলিণ্ডার ডেলিভারি নিয়ে আমরা দুবেলা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার নৃত্য করি। ঠিক তেমনই ভুয়ো ভ্যাক্সিনের লাইনে দাঁড়িয়েও নিশ্চিন্তে থাকি। করনোকে জব্দ করবো আশা করে। লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে পুত্রকন্যার জন্য একটা সরকারী চাকরির বন্দোবস্ত করতে গিয়েও ভুয়ো আধিকারিকদের খপ্পরে পড়ে সর্বসান্ত হয়ে যাই। আর আরও আশ্চর্যের ঘটনা ঘটে, সেই আমরাই আবার যখন পুলিশের জালে কোন জালিয়াতের ধরা পড়ার খবর দেখে বিস্মিত হয়ে উঠি। পরস্পর আলাপ আলোচনা করি। দেশটা রসাতলে যাবে এবার। প্রশাসন থাকতে কি করে চলতে থাকে এইসব, ইত্যাদি ইত্যাদি।

হ্যাঁ, এও আর এক জালিয়াতি। জালিয়াতি নিজের বিবেকের সাথে। জালিয়াতি নিজের শিক্ষা ও দীক্ষার সাথে। অবশ্য সে যদি সত্যিই কিছু অবশিষ্ট থাকে আমাদের আজ। ভোটে জেতা জালিয়াতদেরকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচবো। অথচ দেশে এত জালিয়াত কি করে ঘুরে বেড়ায় ধুয়ো তুলে অপছন্দের রাজনৈতিক দলের মুণ্ডুপাত করবো। আর যে যে দলকে জেতাতে বুথে বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে নাগরিক অধিকারের পবিত্র কর্তব্য পালন করে আহ্লাদে আটখানা হবো। সেই সেই দলের কোন অপরাধ ভুল ত্রুটির দিকে ভুলেও চোখ খুলে তাকাবো না। এটাই কিন্তু দিনের শেষে সবচেয়ে বড়ো জালিয়াতি। যে জালিয়াতি সংস্কৃতিরই সন্তান আমরা সবাই। হ্যাঁ আমি এবং আপনিও। তাই কথায় বলে ঠগ বাছতে গাঁ উজার।

৬ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s