নিমিত মাত্র হুঁ ম্যায়

ধরা যাক আপনার জীবনীগ্রন্থ ছাপা হয়ে গিয়েছে। খুবই আনন্দের খবর। আপনার ইচ্ছা সেই গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন হোক আপনারই বাড়িতে। কিংবা ধরা যাক আপনার প্রকাশকের ইচ্ছা অনুসারেই সেই গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠান আপনার বাড়িতেই আয়োজিত হলো আপনারই জন্মতিথিতে। আপনি আমন্ত্রণ করলেন আপনার বন্ধুবান্ধব কিংবা শহরের বিশিষ্টজনেদের। যাঁদের সাথে আপনার যোগাযোগ রয়েছে কোন না কোনভাবে। তাঁরা এলেন। মহা সমারোহে গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয়ে গেল আপনারই নিজের জীবনী গ্রন্থ। লেখক প্রকাশক সকলের উপস্থিতিতেই। আপনার আতিথেয়তায় সকলেই খুশি হয়ে আহারাদি সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরে যাবেন। সেই ফাঁকেই অতিথি অভ্যাগতদের কাছে হঠাৎ তাঁদের প্রত্যেকের গাড়ির ড্রাইভারের নাম ও ফোন নং জানতে চাওয়া হলো। অতিথিরা ভাবলেন, বুঝি তাঁদের ড্রাইভারদের জন্যেও কিছু জলযোগের বন্দোবস্ত করতেই এই কাণ্ড! অনুষ্ঠান শেষে খুশি মুখে অতিথি অভ্যাগত নিমন্ত্রীতরা যখন আপনার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে নিজ নিজ গাড়ীতে উঠতে যাবেন। তখনই তাঁরা নিজ নিজ ড্রাইভারের কাছ থেকে জানতে পারলেন, আপনার বাড়ি থেকে প্রত্যেকের গাড়িতে বইয়ের দুটি করে প্যাকেট উঠিয়ে দিয়ে প্রত্যেকের ড্রাইভারের হাতে একটি করে বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্যই আপনার নিমন্ত্রীত অতিথিরা যার পর নাই অবাক হয়ে সেই বিলের দিকে এক পলক তাকাবেন। কি ব্যাপার? বিষয়টি কি। এমনটিই প্রথমিক ভাবে মনে হবে সকলের। আর তার পরই তারা আবিষ্কার করবেন সেই বিলে বই পিছু ৩৯৯৯ টাকা অর্থ মূল্যে ১৯টি বইয়ের দাম ও তার উপরে ১০ শতাংশ কমিশন কেটে নিট প্রদেয় বাবদ ৬৮ হাজার ৩৮৩ টাকার হিসেব‌ লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। আপনি ভাবছেন, আপনার সাথে মস্করা করছি? না। একদমই নয়। আপনি যাই ভাবুন না কেন। নিশ্চয়ই আমার উপরে খুব চটে যাবেন। আপনার সম্বন্ধে এমন নীচু ধারণা পোষণ করার জন্য যে, আপনি নিজের বইয়ের বিক্রীর জন্যে এতটাও নীচে নামতে পারেন। আপন মানসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে।

না, আমি বা আপনি হয়তো কেন নিশ্চয় এতটা নীচে নামতে পারবো না। সে নিজের জীবনী লেখা বইয়ের প্রকাশই হোক। আর নিজেরই লেখা বই প্রকাশের বিষয় হোক। পরিচিত বন্ধুবান্ধবই হেক আর শহরের বিশিষ্টজনই হোক। কাউকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে। তাঁরই অজান্তে তাঁরই গাড়িতে কয়েক কপি বইয়ের বাণ্ডিল তুলে দিয়ে। একটা মোটা অংকের বিল গাড়ির ড্রাইভারের হাতে ধরিয়ে দিতে পারবো না আমরা কেউই। আমাদের আত্মমর্য্যাদায় লাগবে। আমরা নিজেদের আত্মসম্মান এইভাবে বিসর্জন দিতে নিশ্চয় রাজি হবো না কেউই। কেন না। এই রকম কোন ঘটনার পরে কারুর পক্ষেই সমাজ সংসারে আর নিজের মুখ দেখানো সম্ভব নয়। যদি আমাদের স্বাভাবিক শিক্ষা ও দীক্ষা থাকে। থাকে পারিবারিক বনেদিয়ানার ঐতিহ্য। কিন্তু সেসব কিছু থাকে না যাঁদের? তাঁরা কি এমন কিছুর সাথে জড়িয়ে পড়তে পারেন না? কি ভাবছেন? খুবই কষ্টকল্পনা হবে তেমনটা ভাবলে? ‌

আসলে ঠিক এমন একটি ঘটনাই ঘটেছে। রাজস্থানের রাজ্যপালের বাসভবনে। ঘটেছে রাজস্থানের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে। অতি সম্প্রতি গত ১লা জুলাইয়ে। রাজস্থান রাজভবনে। পদাধিকার বলে প্রতি রাজ্যের রাজ্যপালই সেই রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য। এবং প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মাথার উপরে সেই আচার্য বিদ্যমান থাকেন। এটাই ভারতীয় রীতি। সংবিধান সম্মত ভাবে। জানি আমরা। রাজস্থানের রাজভবন থেকে রাজ্যপালের আশিতম জন্মতিথিতে রাজ্যপালের জীবনীগ্রন্থ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল রাজ্যের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে। স্বভাবতই তাঁরা সেই উপলক্ষে সমবেত হয়েছিলেন রাজ্যের রাজভবনে। আর ঠিক সেখানেই ঘটেছে এই ঘটনাটি। আপাতত ভাবে যাকে কষ্টকল্পনা বলেই মনে হতে পারে। এবং বাড়ি ফিরে তাঁরা প্যাকেট খুলে দেখতে পান রাজ্যপালের জীবনীগ্রন্থের ২০টি কপি। যার একটি তাঁদেরকে ব্যক্তিগত ভাবে কমপ্লিমেন্টরি হিসাবে বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ১৯টি কপির জন্য প্রদেয় অর্থমূল্য ধার্য্য করা হয়েছিল ঠিক ৬৮ হাজার ৩৮৩ টাকা মাত্র। আবার আরও মজার বিষয়। তাঁদের ড্রাইভারদের হাতে রাজভবন থেকে ধরিয়ে দেওয়া সেই বিলে আরও ৪টি বইয়ের নামের উল্লেখ ছিল। কিন্তু প্যাকেটগুলিতে ছিল কেবলমাত্র রাজ্যপালের জীবনীগ্রন্থের কপিগুলিই। তথ্যসূত্র

গোটা ঘটনাটি যাঁরা বিশদে জানতে চান। তাঁদের জন্য তথ্যসূত্রে লিংক দেওয়া রইল। ক্লিক করলেই নির্দিষ্ট ওয়েবলিংকে গিয়ে মূল ঘটনার বিশদ বিবরণ জেনে নিতে পারবেন। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর অবশ্য রাজস্থান রাজভবন থেকে টুইট করে জানানো হয়, ‘নিমিত মাত্র হুঁ ম্যায়’ জীবনীগ্রন্থের বিক্রয়কাণ্ডের বিষয়ে রাজ্যপাল কিছুই জানতেন না। আমরা বরং ঘটনার ভিতরে আজকের ভারতবর্ষের একটা স্পষ্ট ছবি পেতে পারি। ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি এখন আমাদের সমাজে রাজনীতিতে এবং শিল্পবাণিজ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনই অমোঘ হয়ে উঠেছে যে, যার হাতে যতক্ষণ এবং যতখানি কিংবা যতটুকু ক্ষমতা। তিনি ততখানি বা ততটুকু ক্ষমতার অপব্যবহার করতে আর পিছুপা হতে রাজি নন। শুধুই কি রাজনীতিবিদ? শুধুই কি শিল্পপতি? শুধুই কি প্রশাসনিক আধিকারিক? সমাজের প্রতিটি স্তরেই ক্ষমতা ও তার অপব্যবহার পরস্পর সংলগ্ন হয়ে চলছে। এবং এই অপব্যবহারকারী কেউই তার অপকর্মের জন্য এতটুকু লজ্জিতও হন না। কোনরকম জাবাবদিহি করতেও রাজি থাকেন না। এটাই আধুনিক ভারতের চিত্র। হ্যাঁ আমি বা আপনি হয়তো আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছে নিজের বই বেচার জন্য এতটা নীচে নাও নামতে পারি। কিন্তু তাই বলে সময় এবং সুযোগ পেলে আমাদের হাতেও ক্ষমতার কোন অপব্যবহার হবে না কোনদিন, এমন নিশ্চয়তা কি দিতে পারি কেউ? সেই ক্ষমতা কি আর অবশিষ্ট রয়েছে ভারতবাসীর? তখন আমরাই আবার বলবো না’তো, নিমিত মাত্র হুঁ ম্যায়? আসুন আজ বরং এই উপলক্ষে ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই মুখ আয়নায় মুখ রেখে দেখা যাক একবার। অন্তত একদিন।

৫ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s