এরাজ্যের বামপন্থা

পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট কোন কালেই সাম্যবাদী অর্থনৈতিক ধারাকে সমাজে প্রয়োগের বিষয়ে উৎসাহী ছিল না। তার মূলত দুইটি কারণ। বাঙালি মানসিকতায় সাম্যাবাদ তাত্ত্বিক আলোচনার পরিসরের বাইরে জীবনের কোন স্তরেই অভিপ্রেত নয়। একটি কথা আমরা কেউই খেয়াল রাখি না, সাম্যবাদ স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবাদকে অবলন্বন করেই একমাত্র গড়ে উঠতে পারে। কোন দেশেই স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবোধের প্রকৃত উন্মেষ ছাড়া সাম্যবাদ গড়ে উঠতেই পারে না। রাশিয়া চীন কিউবা প্রভৃতি দেশে আগে স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটেছিল বলেই সাম্যবাদের উত্থান সম্ভবপর হয়ছিল। বাঙালির মতো একটি দ্বিখণ্ডিত জাতিসত্ত্বায় সেই স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবোধের উন্মেষও আবার কোনদিনও সম্ভব নয়। না মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ী বাংলাদেশেও এই ঘটনা ঘটেনি। ব্রিটিশের হাতে গড়ে দেওয়া ভারতীয় মানচিত্রে যে স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবোধ আমাদের মধ্যে দেখা যায় তা আদপে মাকাল ফলের মতো। ফলের গণ্ডীতেই পড়ে না। আর সেই কারণেই সেই দেশের তৈরী সংবিধানকে স্বীকার করে নিলে প্রকৃত স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠার কোন রাস্তা থাকে না যেমন সত্যি, ঠিক তেমনই সত্যি, সেই সংবিধানের স্বীকৃত পরিসরে সাম্যবাদী অর্থনৈতিক ধারাকে সামাজ বাস্তবতায় বাস্তবায়িত করাও সম্ভব হয় না। এইরাজ্যের বামপন্থী নেতৃত্ব প্রথম লগ্ন থেকেই সেই পথেই তাই হাঁটে নি কোনদিন। তাই এখানে বামপন্থা কোনদিনও বামপন্থী বা সাম্যবাদী ছিল না, আর তাই তার দিশাহারা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটবেই বা কি করে?

বামপন্থী দলগুলির আজকের মূল সমস্যা তাই চরিত্রগত নয়। এবং তাত্ত্বিক নীতিনির্ধারণের সমস্যাও নয়। তাদের মূল সমস্যা যে পথে তারা ভারতীয় রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায়নের মগডালে উঠে পড়েছিল, সেই পথটি আজকের একমেরু বিশ্বের বিশ্বায়নের গ্যাঁড়াকলে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার পরিসর এখানে নেই। শুধু এই বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকের সময় থেকে আজকের বাংলা প্রায় ভিনগ্রহের বাসিন্দা! তাই বামপন্থীদের দিশাহারা হওয়ার কারণ সাম্যাবাদের প্রকরণ জনিত নয়। সময় চলিয়া গিয়াছে কুড়ি কুড়ি বছর পার। এই কারণেই আজকে বামপন্থী দলগুলিকে ভরসা করতে হচ্ছে হবে ডানপন্থী দলগুলির সামুহিক ব্যার্থতার উপরেই। তাই সেই ব্যার্থতার পেছন দুয়ার দিয়েই আবার তাদের ক্ষমতায় ফেরার একমাত্র পথ। তারা সেটা ভালো করেই জানে বলে দোষারোপের অঙ্গুলি উত্তলনের উপরেই বিরোধীতার ভরকেন্দ্রকে খারা রাখার প্রায়াস করে সর্বদা। এছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প পথ খোলা নাই। তাই আমাদের দেশে সাম্যবদের তাত্ত্বিক আলোচনা, সেই সুত্রে মার্কস এঙ্গেলস গ্রামশীর প্রাসঙ্গিকতা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক আজকের দিনেও। ব্রিটিশের তৈরী মানচিত্র মেনে নিলে এটাই অবধারিত ফল। সবার আগে প্রয়োজন কোনটা দেশ আর কোনটা দেশ নয়, সেই ধারণাটা সুস্পষ্ট করে অস্থিমজ্জায় জায়মান করে তোলা। তবেই প্রকৃত স্বদেশ চেতনা ও জাতীয়তাবোধ জেগে ওঠা সম্ভব। তারপর সাম্যবাদ। তারপর তো মার্ক্সীয় না গ্রামশীও তার প্রসঙ্গ।

আর এই প্রসঙ্গে শেষে একটি কথাই বলার। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ধারা ও সমাজবাস্তবতা ঠিক আন্তর্জাতিক কোন তাত্ত্বিক কাঠামোয় গড়ে ওঠে না। তা গড়ে ওঠে সমাজ দেহের আভ্যন্তরিক তাগিদ থেকে। তাই রাশিয়ার সমাজবিপ্লব রাশিয়ারই। মার্কস সেখানে উপলক্ষ মাত্র। চীনের সমাজবিপ্লব চীনেরই নিজস্ব। সেখানে মার্কস লেলিন গ্রামশীর ভুমিকা প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখাও দেয়নি। কিউবার সমাজবিপ্লবও স্বদেশীয়। রফতানী করে সমাজবিপ্লব হয় না। হবেও না।

৪ঠা জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s