ভোটারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা

ভোট আসে ভোট যায়। আমি আপনি ভোটের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি। কখন বুথের ভিতরে ঢুকব। আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরব। তারপর নির্বাচনী ফলাফলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা! আপনার প্রদত্ত ভোটে প্রার্থী বিজয়ী হলে আপনার আনন্দের অন্ত নাই। কেননা এই ভোটটি আপনি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর বা নীতির উপর নির্ভর করে দিয়েছেন। আপনার ভোটে প্রার্থীর বিজয় মানে আপনি যে বিষয়গুলির জন্য নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক দলকে জেতাতে সেই দলের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন, সেই বিষয়গুলির পক্ষেই জনগণের রায়। ফলে এই জয় আপনারই জয়। এই অব্দি ভারতীয় সংবিধান নাগরিক হিসাবে আপনার নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে পারলো। কিন্তু মুশকিল হলো ঠিক তখনই, আপনার ভোটে বিজয়ী প্রার্থী যখন দলত্যাগ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ গ্রহণ করলো। করলো তার নির্বাচিত আসনটি ধরে রেখেই। যে আসনটিতে কোন একটি নির্দিষ্ট দলকে পরাজিত করতেই আপনি ভোটের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্থাৎ আপনি ‘খ’ দলকে পরাজিত করতে ‘ক’ দলের মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করেছেন আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী রাজনেতিক স্বার্থে সেই ‘ক’ দলের হয়ে নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী যখন ‘খ” দলে গিয়ে যোগ দেয়, তখন সেটি কিন্তু আপনার প্রদত্ত ভোটের প্রতি সরাসরি এবং চুড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা। বিশ্বাসঘাতকতা হতো না, যদি সংবিধানে এমন একটি ধারা থাকতো, যার বলে নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী দলত্যাগ করা মাত্র, সেই আসনের নির্বাচন বাতিল হয়ে যেত। তাহলে প্রার্থী নির্বাচিত আসনের বিজয়ী প্রতিনিধি হিসাবে অন্য দলে যোগ দিতে পারতো না। যোগ দিত সধারণ নাগরিক হিসাবে। একটি রাজনেতিক দল ত্যাগ করে অন্য একটি রাজনেতিক দলে চলে যাওয়া, যে কোন রাজনৈতিক কর্মীর মৌলিক অধিকারের বিষয়। এই নিয়ে কোন তর্ক চলতেই পারে না। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে জিতে অন্য কোন রাজনেতিক দলে সেই নির্বাচিত আসন সমেত যোগ দেওয়া সরাসরি ভোটারদের সাথে নিদারুন বিশ্বাসঘাতকতা।

ভারতীয় রাজনীতিতে বিগত সাড়ে সাতদশক ব্যাপি ঠিক এই বিশ্বাসঘাতকতাই ঘটে চলেছে ভারতবর্ষের নাগরিক ভোটারদের সাথে। সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয় ভারতীয় সংবিধানকে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে। দলত্যাগী প্রার্থীর নির্বাচিত আসন তৎক্ষণাৎ বাতিল করে দেওয়ার মতো কোন ক্ষমতা সংবিধানকে দেওয়া হয় নি। অর্থাৎ সংবিধান রচনার সময়েই এই ফাঁকটি তৈরী করে রাখা হয়েছিল, যাতে ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলি পরবর্তীতে এর সুযোগ সুবিধা নিয়ে ক্ষমতাদখল করতে পারে পিছনের দরজা দিয়ে হলেও। যে রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক আদর্শ যত বেশি নিকৃষ্টমানের, সেই রাজনৈতিক দলই সংবিধানের এই ফাঁকটি তত বেশি করে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখল করে, বা রাজনৈতিক জমি বাড়িয়ে নেয়। এই সবই হয় ভারতবর্ষের সংবিধান মেনেই।, ভারতবর্ষের কোন রাজনৈতিক দলকেই সংবিধানের এই ফাঁক বন্ধ করার জন্য, প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনের আন্দোলন করতে দেখা যায় না। তার একটিই কারণ, প্রত্যেক দলই জানে প্রয়োজনের সময় এই ফাঁকটিই ক্ষমতা দখল বা রাজনৈতিক জমি বাড়িয়ে নেওয়ার বিষয়ে তুরুপের তাসের মতো কার্যকরি। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল প্রকৃতি।

৩রা জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s