মগজে কারফিউ

মগজে কারফিউ জারি হয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের হর্তাকর্তা বিধাতারা যা বলবেন, যখন বলবেন, যেভাবে বলবেন, ঠিক তেমনভাবেই ভাবতে হবে ও ভাবাতে হবে আমাদেরকে। অন্য কোন ভাবে ভাবলেই আপনি দেশপ্রেমী নন। অন্য কোন ভাবে ভাবালেই আপনি অবশ্যই দেশদ্রোহী। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদেরই মদতদাতা। অতএব আপনার ভাগ্যে ঘচাং-ফু হয়ে যেতে পারে যেকোন সময়েই। এখন রাষ্ট্রযন্ত্র তো একটি বিমূর্ত সত্তা। রাষ্ট্রযন্ত্রের হর্তাকর্তা বিধাতারা, সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু ক্ষমতা দখল করেই তাঁরা যখন রাষ্ট্রীয় শীলমোহর লাগিয়ে মগজে কারফিউ জারি করে দেন, মুশকিল হয় তখনই। আর তখনই আপনাকে বাঁদর নাচ নাচতে হবে। নাচতে না চাইলেই আপনি রাষ্ট্রের শত্রুর তকমায় ভূষিত হয়ে যেতে পারেন। আর ঠিক এই ভয়টাই সকলের থেকে বেশি করে পেয়ে থাকেন তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষজন। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে, কোনভাবেই যেন সরকারী দলের গুডবুক থেকে নিজের নামটা কাটা না যায়। তাই তারাই মগজে কারফিউ জারি হয়ে গেলে, নিজেদের মগজগুলি যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে দেন। এর আরও একটি ভালো দিক রয়েছে, একবার নিজের মগজ জারি করা কারফিউয়ে বন্ধক রাখতে পারলেই, সরকারী উপঢৌকন নিশ্চিত। কারণ সরকার এইসব বন্ধকী মগজগুলিকে কাজে লাগিয়েই সাধারণ জনগণের মগজের উপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে তার জন্য অমূল্য পুরস্কারের বন্দোবস্ত তো রাখতেই হবে।

এই যেমন কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ কতটা সাংবিধানিক আর কতটা অসাংবিধানিক ভাবে সংঘটিত হয়েছিল, সেসব আলোচনা করতে গেলেই বিপদ। কাশ্মীর উপত্যাকায় কারফিউ জারির সাথে সাথেই দেশবাসীর মগজেও সেই কারফিউ বলবৎ হয়ে গিয়েছিল। ফলে অবরুদ্ধ কাশ্মীরে ধর্ষিত মানবাধিকার নিয়ে আলোচনার সব পরিসরই তখন থেকেই বন্ধ। এবং সেই থেকে মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত খবর হজম করতে দুইবেলা ওঠবোস করতে হচ্ছে আমাদের। নাহলেই বিপদ। কে আর সাধ করে সেই বিপদে পা দিতে চায়। চায় না বলেই সারা দেশ জুড়ে কাশ্মীর নিয়ে এক নিস্তব্ধ নিরবতার চাদর বিছিয়ে রেখেছি আমরাই। মিডিয়ার ঢোলের সাথে সংগত করাই বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে সঙ্গত কাজ এখন। সকলে সেটাই করছে। দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বচন মুখস্থ করা ও সেই অনুসারে তোতাপাখির বুলি আউরানোই দেশপ্রেম এখন। এখন শুধু দেখার বিষয় একটাই কে কত বড়ো দেশপ্রেমিক। তারও আগে ঠিক এইরকমই ঘটনা ঘটেছিল পুলওয়ামার ঘটনাতেও। আমরা কোন প্রশ্ন করিনি। করতেও চাই নি। আমাদের যেমনটি বোঝানো হয়েছিল। তেমনটিই বুঝে গিয়েছিলাম আমরা। আমরা বুঝে গিয়েছিলাম পুলওয়ামার শহীদদের সম্মানে শাসক দলকেই ফের লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত করতে হবে নিরঙ্কুশ ভাবে। আমরা ঠিক সেটিই করেছিলাম। আমরা ভেবেও দেখতে চাইনি, যে সরকার থাকতে পুলওয়ামার মতো ঘটনায় এতজন জোয়ানকে শহীদ হতে হয়। সেই সরকারের হাতে আমাদের দেশ কতটা নিরাপদ। আমরা সেকথা ভেবে দেখতে চাইনি কারণ। আমাদের মগজে ততক্ষণে কারফিউ জারি হয়ে গিয়েছিল বালাকোটের স্ক্রিনশট দেখিয়ে। যদিও সেই স্ক্রিনশটে কোথাও নয়শো পাকিস্তানি জঙ্গী নিকেশের সংলাপ, তো কোথায় তিনশো। কোথাপ পাঁচশো। না স্ক্রিনশটের এতরকম ভেরিয়েশন নিয়ে আমরা ভাবতে রাজি হই নি। আর হবই বা কেন? সারাদিন ধরে লাইভ টেলিকাস্টে অভিনন্দনের ম্যান অফ দ্য মোমেন্ট শো’তেই সারা ভারত তখন হাউজফুল! এবং তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলাম। কে কত বড়ো দেশপ্রেমিক তার পরীক্ষা দিতেই বিশেষ একটি চিহ্নে আঙুল ছোঁয়াতে হবে। ফল ফলেছিল হাতেনাতে।

তারপর গঙ্গা দিয়ে আরও অনেক জল গড়িয়ে আজ এই অতিমারীর পরিস্থিতিতে বিপদ যখন আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই কড়া নাড়ছে। তখনো আমাদের মগজে কারফিউই বলবৎ রয়েছে। আমরা তাই থালা বাজালাম। হাততালি দিলাম। ঘড়ি ধরে ক্যালেণ্ডারের তারিখ মিলিয়ে আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় করোনার সাথে মোকাবিলায় দেশজুড়ে ঐক্যবদ্ধ হলাম। আমাদের দেশপ্রেমের ভক্তিতে। আমরা বিশ্বাস করলাম গোবরের মহিমায়। আমরা বিশ্বাস করলাম গোমূত্রের কার্যকারিতায়। আমরা বিশ্বাস করে নিলাম গরুর দুধে সোনা থাকার তত্ত্ব। পরিযায়ী শ্রমিকদের মহাকাব্যিক পায়ে হাঁটার ইতিহাসকেও আমরা দেশপ্রেমের ভক্তিতে অগ্রাহ্য করে তাকিয়েও দেখলাম না। আমরা বিশ্বাস করলাম, করোনাকালে ভারতবর্ষই বিশ্বকে এই অতিমারী থেকে উদ্ধার করবে। ভ্যাক্সিনগুরুর কথায় আমাদের বুক গর্বে প্রায় ছাপ্পানো ইঞ্চীর মতোই ফুলতে থাকলো। তাই অক্সিজেনের হাহাকারে ঝপঝপ করে হাজার হাজার প্রাণ ঝরে পড়তে দেখেও আমরা নিজেদের মগজে নিজেরাই কারফিউ জারি করে দিলাম নতুন করে। আমরা কেউ প্রশ্ন করলাম না। ২০২০ সেলের ঘোষণা অনুযায়ী অতিমারী মোকাবিলায় বরাদ্দ করা সেই কুড়ি লক্ষ টাকার হদিশ কোথায় গেল? কি করা হয়েছিল সেই অর্থে? কেন এত হাসপাতালের হাহাকার। কেন এত অক্সিজেনের হাহাকার। কেন এত ভ্যাক্সিনের হাহাকার? হাতে তো দেড় বছর সময় পাওয়া গিয়েছিল। না শববাহী গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়েও ভারতবাসীর মগজে জারি করা কারফিউ বহাল রইল। কারণ আমরা এতদিনে বুঝে গিয়েছি। মগজে কারফিউ জারি থাকলেই কোতয়ালের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। মগজে কারফিউ জারি থাকলেই আইন আদালত কারাগারের চক্করে পড়ার কোন ঝুঁকি থাকবে না। আমরা স্পষ্ট বুঝে গিয়েছি, যাঁদের যাঁদের মগজে কারফিউ জারি করা যায়নি, তাঁরাই ইউএপিএ আইনের আওতায় ধরা পড়ে গিয়েছে। না, আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই। আর মগজে কারফিউ জারি না থাকলে এই দেশে নিশ্চিন্তে ঘুমানোরও কোন পথ খোলা নেই আর।

২রা জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s