তরল হীরে ভ্যাক্সিন

রাতভোর লাইন দিয়েও ভ্যাক্সিন মিলছে না অনেক জায়গাতেই। চাহিদার তুলনায় যোগান কম। সরকার বিপুল পরিমাণ চাহিদার তুলনায় মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ভ্যাক্সিন পোঁছিয়ে দিতে পারছে না। কারণ সরকার ভ্যাক্সিন তৈরী করছে না। নির্ভর করছে বেসরকারী ভ্যাক্সিন প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির উপরে। চাহিদার তুলনায় যোগান নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও বেশি সংখ্যক ভ্যাক্সিন প্রস্তুতকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। যাতে বেশি সংখ্যক মানুষকে ভ্যাক্সিন দেওয়া যায়। এদিকে আতঙ্কগ্রস্ত নাগরিক একটা দুটি ভ্যাক্সিনের জন্যে এদিক থেকে ওদিক ছোটাছুটি করছেন। আর ভাগ্যবান যারা ভ্যাক্সিনের একটি ডোজ শরীরে ঢোকাতে সমর্থ হচ্ছেন। তাঁরা আপাতত হাঁফ ছাড়ছেন। যাক একটা তো হলো। দ্বিতীয়টর জন্য হাতে বেশ কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। আর অতি সৌভাগ্যবান যাঁরা দুটি ডোজ নিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের তো কথাই নেই। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত বলে মনে হচ্ছে নিজেকে। কিন্তু তাঁদের কজনের জানা রয়েছে, যে ভ্যাক্সিন শরীরে ঢুকিয়ে তাঁরা করোনার রক্ষাকবচ জোগার করে ফেলেছেন বলে বিশ্বাস করছেন। সেই ভ্যাক্সিন প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিই জানিয়ে রেখেছে। এই ভ্যাক্সিন নিলেই যে করোনা হবে না। তেমন কোন নিশ্চয়তা নেই। অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে বেশ কয়কেজন চেনা পরিচিত মানুষজনের মৃত্যুর খবরও পেয়ে থাকবেন। যাঁরা একটি বা দুটি ডোজ ভ্যাক্সিন নিয়েও হঠাৎ করোনা সংক্রমিত হয়ে মারা গিয়েছেন। মজার কথা, সরকার বা বেসরকারী মিডিয়া। কেউই ভ্যাক্সিন গ্রহীতাদের ভিতরে কতজন করোনা সংক্রমিত হচ্ছেন। আর কতজন মারা যাচ্ছেন। তার কোন সঠিক তথ্যই আমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন না। অথচ নিয়ম করে এবং ফলাও করে আজ দেড় বছর ধরে প্রতিদিনের করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর প্রচারিত হচ্ছে।

অনেকেই হয়তো জানেন না। ভারতে যে ভ্যাক্সিনগুলি মানুষকে দেওয়া হচ্ছে। সেগুলি আসলে ট্রায়াল রান হিসাবে এখনো পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরেই রয়েছে। যেগুলিকে জরুরী ভিত্তিতে মানুষের শরীরে ইনজেক্ট করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে মাত্র। করোনা সংক্রমণের ঢেউ সমালানোর উদ্দেশে। অর্থাৎ এই ভ্যাক্সিনগুলি আমাদের শরীরে কিরকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সেগুলি নিয়ে পরবর্তীতে গবেষণা চলতে থাকবে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি খবরে প্রকাশ লণ্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন। যাঁরা আস্ত্রাজেনেকা ভ্যাক্সিনের দুটি ডোজ নিয়েছেন। তাঁদের ভিতরে যাঁদেরকে পরীক্ষামূলক ভাবে অতিরিক্ত তৃতীয় একটি বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের শরীরে করোনার প্রতিরোধ শক্তি অনেক বেশি বৃদ্ধি পয়েছে তুলনামূলক ভাবে। এখন এই খবরের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইডিশ ব্রিটিশ মাল্টিন্যাশানাল ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী আস্ত্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাক্সিনই এই কোভিশীল্ড। যা পুনের সিরাম ইনস্টিটিউটে তৈরী করা হচ্ছে ভারতবর্ষ সহ, বিশ্বের আন্যান্য অঞ্চলের জন্যেও। ফলে যাঁরা ইতিমধ্যেই কোভিশীল্ডের দুটি ডোজ নিয়ে মহানন্দে নিশ্চিন্তে ছিলেন। তাঁরাই এবারে এই খবরে তৃতীয় ডোজের জন্যে লাইনে দাঁড়াতে উৎসাহী হয়ে উঠবেন। এবং অচিরেই ভারতেও কোভিশীল্ডের তৃতীয় ডোজের বাণিজ্য শুরু হয়ে যাবে। কথায় বলে বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী। ফলে আবারও তৃতীয় ডোজ। এবং সেই সাথে তৃতীয় ঢেউয়ের আগাম সতর্কবার্তা তো রয়েইছে। কেউ কথা দিতে পারবে না, তৃতীয় ডোজের পরে কোন চতুর্থ ডোজও নিতে হবে না। শেষে এমনও দেখা যেতে পারে যতদিন জীবন ততদিন ভ্যাকসিন। অর্থাৎ প্রতি জন্মদিনে একডোজ ভ্যাক্সিন নিয়ে সেই বছরের বেঁচে থাকার প্রকল্প রূপায়ণ করতে হচ্ছে।

তরল সোনা পেট্রোলিয়ামের দিন শেষ হওয়ার আগেই তরল হীরে ভ্যাক্সিন বাণিজ্যের যুগ শুরু হয়ে গেল। এখন ভ্যাক্সিনের চাবিকাঠি যার হাতে। তারই ইচ্ছেয় তারই নির্দেশে চলবে পৃথিবী। এই ভ্যাক্সিনের যত রকমের সাইড এফেক্ট হবে। তত রকমের নতুন নতুন মেডিসিনের আবিস্কার ও বাণিজ্যও ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকবে। তত রকমের সুপার স্পেশালিটি হসপিটালের ব্যবাসাও রমরমিয়ে চলতে থাকবে। জমে উঠবে তত রকমের পেশাও। ফলে করোনার গেট দিয়ে এই এক ভ্যাকসিন সংস্কৃতি শুরু হয়ে গেল। আবিশ্ব প্রতিটি মানুষকেই ভ্যাক্সিন নিয়ে যেতে হবে নির্র্দিস্ট সময়ের ব্যবধানে নিরন্তর। সমাজ সংসারে চলতে গেলে। মোবাইলের সিম ভ্যালিডিটি চালু রাখার মতোনই শরীরে ভ্যাকসিন ভ্যালিডিটিও চালু রাখতে হবে মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। আর ততই ফুলে ফেঁপে উঠবে ভ্যাক্সিন বাণিজ্যের ভাঁড়ার।

৩০শে জুন’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s