সর্ষের মধ্যেই ভুত

আসুন একটা কথা মন খুলে স্বীকার করে নেওয়া যাক। রাজ্য সরকার ও তার প্রশাসনের ভিতরে অনেক রকমের গলদ রয়ে গিয়েছে। সরকারে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী সমর্থক ও ভোটার, আপনি যেই হোন না কেন। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কে কি বলছে। সেটি বড়ো কথা নয়। শাসকদলের কর্মী সমর্থক ও ভোটার হিসেবে আপনারও দায় রয়েছে এই কথা স্বীকার করে নেওয়ার যে, হ্যাঁ অবশ্যই সর্ষের মধ্যে ভুত রয়ে গিয়েছে। সত্যকে স্বীকার করার ভিতরে কোন পরাজয় নেই। বরং আত্মপ্রত্যয়ের দৃঢ়তাই প্রতিষ্ঠিত হয় তাতে। উল্টে, সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় ভীরুতার দুর্বলতাই প্রকাশ হয়ে পড়ে। ঠিক যেমন হয়েছিল, সারদা কেলেঙ্কারির সময়। গলায় ‘আমরা সবাই চোর’ প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে নাগরিক সঙ বের করার দিনে। তাতে দেশবাসীর চোখে খুব যে বিশেষ সম্মানবৃদ্ধি হয়েছিল শাসকদলের, তা কিন্তু নয় আদৌ। সারদার টাকা কোন ম্যাজিকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিল। কারুরই সেদিন বুঝতে বাকি ছিল না। কিন্তু সে ছিল পকেটমারদের হাতসাফাই। রাজনীতির পরিশীলিত পরিভাষায় যাকে বলা হয়, আর্থিক কেলেংকারী। যদিও বেশ কয়েকজন মানুষ আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অসম্মানের কবলে পড়ে আত্মহননের পথে এগোতে বাধ্য হয়েছিল। সেই দাগ কিন্তু আজও লেগে রয়েছে। এখনো মামলা আদালতে বিচারাধীন। বিচারের রায় প্রকাশের আগে সেই দাগ দূর হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। কয়েকজন মানুষের স্বার্থে সারদায় সাধারণ মানুষের লগ্নীকৃত টাকা হাপিশ হয়ে যাওয়া এক বিষয়। সেও জালিয়াতি। কিন্তু তার অর্থ পরিস্কার। ভারতবর্ষে তেমন ঘটনা নতুনও কিছু ছিল না। কিন্তু কসবায় ও সিটি কলেজের ভুয়ো ভ্যাক্সিন কাণ্ড কিন্তু নজিরবিহীন। এবং তার উদ্দেশ্য কিন্তু অনেক গভীর। একজন দেবাঞ্জন দেব নিশ্চয় জাদুকর ম্যানড্রেক নয়। যে আশে পাশে সকলকেই সম্মোহিত করে রেখে দেবে। তাও আবার দিনের পর দিন ধরে। সরকার থেকে প্রশাসন, নবান্ন থেকে কর্পোরেশন। কেউ টের পাবে না। একজন জালিয়াত নকল আই এ এস সেজে কর্পোরেশনের নিশান লাগানো গাড়ি নিয়ে দাপিয়ে বেড়াবে। নকল কর্পোরেশনের অফিস খুলে ভুয়ো চাকরীতে লোক নিয়োগ করছে। কর্পোরেশনের আধিকারিকের সই জাল করে ব্যাংকে একাউন্ট খুলছে কর্পোরেশনের নামেই। কেউ যদি মনে করে, সরকার ও প্রশাসনের, নবান্ন ও কর্পোরেশনের কারুর সহায়তা ছাড়া এত দিন ধরে এমন ভয়ানক জালিয়াতি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে মড়া মানুষও হেসে উঠবে।

আর ঠিক এইখানেই আজকে আসল পরীক্ষা কিন্তু শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের। কারা দেবাঞ্জন দেবকে সাহায্য করতো। তাদের আসল স্বার্থ কি ছিল। সেই সত্য টেনে বার করতে না পারলে সবচেয়ে ক্ষতি কিন্তু সদ্য নির্বাচিত সরকারের। এবং বিশেষ ভাবে শাসকদলের। কারণ খুব সহজ। ভুয়ো ভ্যাক্সিন কাণ্ডে মুখ পুড়েছে কিন্তু সেই সরকার ও তার প্রশাসনেরই। এই কাণ্ডে সবচেয়ে বেশি লাভ কোন পক্ষের। সেটা রাজ্যবাসীর সকলেই বুঝতে পারছে। এখন শাসক দলের ভিতরে কারা কারা শাসকদলকেই বেকায়দায় ফেলতে উঠে পড়ে লেগেছে। সেটা বার করার দায় ও দায়িত্ব শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বেরই। এই ঘটনা কিন্তু সারদাকাণ্ডের মতো ধামাচাপা দিতে গেলে, সেটা নিজের পায়েই কুড়ুল দেওয়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আর শক্তিবৃদ্ধি করতে থাকবে শাসকদল বিরোধী নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তি।

কলকাতা কর্পোরেশনের কেউ জড়িত নয়। নাবান্নের কেউ জড়িত নয়। অথচ একজন জালিয়াত একবার নিজেকে যুগ্ম সচিব পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলে পরিচয় দিচ্ছে। রবীন্দ্র আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন ফলকে সেই নাম খোদাইও হচ্ছে অনুষ্ঠান করে ম্যারাপ বেঁধে। আবার ভুয়ো ভ্যাক্সিন কাণ্ডে সেই একই ব্যক্তি নিজের পরিচয় দিচ্ছে কর্পোরেশনের জয়েন্ট কমিশনার হিসাবে। শুধু পরিচয়ই দিচ্ছে না। সেই পরিচয়েই প্রকাশ্য দিবালোকে কর্পোরেশনের নিশান লাগানো গাড়ি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাসকদলের নেতা মন্ত্রীদের সাথে তার ছবি উঠছে। পুলিশ আধিকারিকের সাথে অনুষ্ঠানের ফিতে কাটছে। একজন সাধারণ জালিয়াতের পক্ষে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ ঘটে কি করে? এক মঞ্চে বসারই বা সুযোগ ঘটে কি করে? না দেবাঞ্জন দেব কোন সাধারণ জালিয়াত নন। সরকার ও তার প্রশাসনের এক শ্রেণীর মানুষের সাথে যোগসাজশ না থাকলে। এই পর্যায়ের জালিয়াতি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় দিনের পর দিন। এখন সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। কর্পোরেশনের নামে  নিখরচায় ভুয়ো ভ্যাক্সিন ক্যাম্প করার আসল উদ্দেশ্য কি ছিল। যদি দেখা যেত মানুষের কাছ থেকে মাথাপিছু মোটা টাকার বিনিময়ে ভ্যাকসিন দেওয়া চলছিল। তাহলে না হয় বোঝা যেত। জালিয়াতির কারণ। কিন্তু তেমনটা তো হয় নি। কারুর কাছ থেকেই কোন টাকা নেওয়া হয় নি। মানুষও টের পায়নি। কর্পোরেশন কোনভাবেই এই ক্যাম্পের সাথে জড়িতই নয়। পুরো বিষয়টিই ভুয়ো। আবার এটাও তো দিনের আলোর মতোন পরিস্কার। ভুয়ো ক্যাম্পের বিষয়টি যাতে পুলিশ প্রশাসনের নজরে আসে, তার জন্যেই ভ্যাক্সিন গ্রহীতাদের কারুর নামেই ভ্যাক্সিন দেওয়ার ভুয়ো সার্টিফিকেট স্বরূপ কোন মোবাইল মেসেজও পাঠানো হয়নি। সাংসদ মিমি চক্রবর্তী ঠিক যে মেসেজ সময় মতো না পাওয়ার কারণেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে নিয়ে আসেন।

আসল খেলা কিন্তু ঠিক এইখানেই। দেবাঞ্জন দেব যত বড়ো জালিয়াতই হোন না কেন। তিনি কিন্তু নিজে থেকেই তাঁকে ধরার ফাঁদ নিজেই পেতে রেখেছিলেন। ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন শিবিরের আয়োজন যিনি করতে পারেন। কর্পোরেশনের নামে ভুয়ো অফিস যিনি খুলতে পারেন। সেই কর্পোরেশনের নামে ভুয়ো চাকরীতে যিনি একাধিক কর্মী নিয়োগ করতে পারেন। ভ্যাক্সিন গ্রহীতাদের মোবাইল নম্বরে তিনি ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন সার্টিফিকেট পাঠাতে পারতেন না ইচ্ছে করলে? এটা বিশ্বাস্য? নিশ্চয় নয়। আর যদি ধরেই নেওয়া যায়, ঐ ভুয়ো সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করা কোন জালিয়াতের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাহলে অবধারিত ভাবে প্রশ্ন ওঠে। সেটা জেনেও কোন জালিয়াতের পক্ষে ভুয়ো ভ্যাক্সিন শিবিরের আয়োজন করা সম্ভব কি আদৌ। কারণ জালিয়াতরা আর যাই হোক না কেন। মূর্খ হতে পারেন না। উল্টে তুখোড় বুদ্ধিমান না হলে কেউ এই পর্যায়ে জালিয়াতি চালিয়ে আসতে পারে না।  

কর্পোরেশনের নামে জালিয়াতি এক বিষয়। কিন্তু কর্পোরেশনের নামে ভুয়ো ভ্যাক্সিন শিবির চালানো সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। দুটি ক্ষেত্রেই ইনসাইড ম্যান ছাড়া এক পা অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য কখনোই অভিন্ন হতে পারে না। প্রথম ক্ষেত্রে বাঁকা পথে উপার্জন উদ্দেশ্য হলেও। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেটি কোন উদ্দেশ্য হতেই পারে না। শাসকদলের কর্মী সমর্থক ভোটারদের এই সহজ কথাটা দ্রুত বুঝে নেওয়া দরকার। যে মুহুর্তে ভ্যাক্সিন গ্রহণের ভুয়ো সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা না করেই ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন শিবির শুরু করে দেওয়া হলো। সেই মুহুর্তেই সরকারের মুখ পোড়ানোর ব্যবস্থায় শীলমোহর পড়ে গেল। অর্থাৎ সরকার ও তার প্রশাসনেই তারা ঘাপটি মেরে রয়েছেন। যারা এই সরকারের পতন দেখতে উৎসাহী। তাদের ভিতর অনেকেই যে শাসকদলের অন্দরে বসে দোল খাচ্ছেন। সেই বিষয় সন্দেহের কোন অবকাশ নাই আজ আর। এখন দায় শাসকদলেরই। তারা কি এই বিপদ নিয়েই ঘর করতে চান। চাইলে অবশ্যই গোটা বিষয়টি সেই আবার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আগের মতোই। কিন্তু এবারে ধামাচাপা দিলে নিজের মৃত্যুবাণে নিজেই শান দেওয়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এখন শাসকদলের কর্মী সমর্থক ভোটাররা কোন পক্ষ নেবেন। সেটা তাঁদের বিষয় একান্তই।

২৮শে জুন’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s