ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন প্রকল্প

এবারে ভুয়ো আধিকারিক। ভুয়ো পরিচয়পত্র। ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্প। কলকাতা কর্পোরেশনের নাম নিয়ে। কর্প‌োরেশনের লোগা সহ। এক আধ দিনের ব্যাপারও নয়। প্রতিদিন শ’য়ে শ’য়ে নাগরিক নাম লিখিয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে সেই ভ্যাক্সিনেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে ভ্যাক্সিন নিচ্ছে। নিখরচায় ভ্যাক্সিন। নিশ্চয়ই সরকারী প্রকল্পেই দেওয়া হচ্ছে। এমনটাই বিশ্বাস ছিল স্থানীয় জনগণের। বিশ্বাসে মিলায় ভ্যাক্সিন। তর্কে বহুদূর। ফলে স্থানীয় সাংসদকেও সেই ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্পে ভ্যাক্সিন নিতে দেখা গিয়েছে। ঠকেছেন তিনিও। এবং সেইটিই আশ্চর্য্যের! রাজ্যে ক্ষমতাসীন শাসক দলের একজন সাংসদ, তাঁর কাছেও খবর ছিল না। গোটা বিষয়টিই ভুয়ো। অর্থাৎ জনগণ কোন তিমিরে বাস করছে। সেটি এই ঘটনা থেকেই নিশ্চিত বোঝা যায়। আশ্চর্য্যের বিষয় আরও রয়েছে। প্রথমত ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কলকাতায়। কোন গণ্ডগ্রামে নয়। দক্ষিণ কলকাতায় কসবা রাজডাঙার ঘটনা। ঝাঁ ঝকঝকে এক্রোপলিস মলের উল্টোদিকে কসবা নিউমার্কেট সংলগ্ন স্থানে এই ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্প চলছিল। গত ১৫ই জুন এই বিষয়ে কলকাতা পুলিশে একটি অভিযোগও করা হয় নাকি কর্পোরেশন থেকে। এবং সবচেয়ে বড়ো আশ্চর্য্যের বিষয় এখানেই। ১৫ তারিখে করা অভিযোগের ভিত্তিতে ভুয়ো আধিকারিককে গ্রেফতার করতেই এক সপ্তাহ লেগে গেল? সাতদিন আগে যাকে গ্রেফতার করলে বহু মানুষ এই ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশনের খপ্পর থেকে বেঁচে যেতেন। কিন্তু তা হয় নি। খোদ কলকাতার বুকেই এই যদি হয় পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতার নমুনা। তাহলে সারা রাজ্যের পরিস্থিতি ঠিক কি রকম, অনুমান করতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

এখন গোটা বিষয়টিই পুলিশি তদন্তের আওতায়। তদন্তে কি উঠে আসে। সেটা পরে জানা যাবে। কে দোষী। কি তার উদ্দেশ্য। কিভাবে সে বিভিন্ন স্থানে এই ধরণের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। কাদের সহায়তায় তার এই কর্মকাণ্ড। ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় টানা তৃতীয় বারের জন্য নির্বাচিত একটি সরকারের নাকের ডগায় খোদ রাজ্য রাজধানীতেই এইরকম ভুয়ো কর্মকাণ্ড দিনের পর দিন চলতে থাকে কি করে? এটাই কিন্তু প্রথম প্রশ্ন। তবে কি ধরে নিতে হবে। এটা সরকারী অপদার্থতারই একটি চূড়ান্ত নমুনা? আমাদের রাজ্যে, সমাজের সকল স্তরেই রাজনৈতিক দলগুলির কর্তৃত্ব সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে যেখানে সরকারী ক্ষমতায় আসীন শাসক দলের অঙ্গুলি হেলন ব্যাতীত কোন সমাজিক প্রকল্প রূপায়ন সম্ভবই নয়। যে কোন পুর অঞ্চল হোক কর্পোরেশন ওয়ার্ড হোক কিংবা গ্রাম পঞ্চায়েত। শাসক দলের অনুমতি ছাড়া কোন রকম সরকারী বেসরকারী প্রকল্প রূপায়ন করা অসম্ভব। এটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থা। সেই অবস্থায় কসবায় চলতে থাকা এই নিখরচায় ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্প। তাও আবার কলকাতা কর্পোরেশনের নামে। এবং শাসক দলের নজর এড়িয়ে। না, এমনটা হওয়া অসম্ভব। আর এখানেই আসল প্রশ্ন। এইরকম ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন শিবির। যা সরকার ও তার প্রশাসনের অপদার্থতার চুড়ান্ত নিদর্শন। সেই শিবির শাসকদলের মদতেই বা সংঘটিত হবে কি করে?

না, এর সঠিক কোন উত্তর এখনই আমাদের হাতে নেই। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শিবির সরকার ও তার প্রশাসনের অপদার্থতা প্রমাণ করতে এমন কোন ষড়াযন্ত্রে যদি লিপ্ত হয়েও থাকে। তবে সেটিও শাসক দলের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না, এতদিন ধরে। দুই একদিন চলতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন ধরে নিশ্চয় নয়। আর বিশেষ করে করোনা মহামারীর এই চুড়ান্ত পরিস্থিতিতে তো নয়ই। যেখানে ভ্যাক্সিনের হাহাকার এমন মারাত্মক ভাবে প্রকট। বিভিন্ন সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভ্যাক্সিনের অভাবে ভ্যাক্সিনেশন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। রাজ্য সরকার ক্রমাগত কেন্দ্র সরকারের কাছে পর্যাপ্ত ভ্যাক্সিন পাঠানোর জন্য নিয়মিত দরবার করে চেলেছে। সেই রকম অবস্থায় একজন ব্যক্তিবিশেষের একক উদ্যোগে ভুয়ো পরিচয়ে একটি ভুয়ো ভ্যাক্সিনেশন শিবির দিনের পর দিন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। শুধু অসম্ভবই নয়। রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে। ফলে একজন দেবাঞ্জন দেবকে ধরলেই গল্প শেষ হয়ে যায় না। গল্পের শুরু বলা যেতে পারে। শাসক দলের কসবার স্থানীয় ইউনিট, সেখানকার নির্বাচিত পুরপ্রতিনিধি কেউ কিছু জানতে পারেনি। কর্পোরেশনের ভ্যাক্সিনেশন প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত দপ্তরের কেউ এই ভুয়ো কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলেও কি সম্ভব এমন ঘটনা ঘটানোর? ভ্যাক্সিনের ডোজ আসল কি নকল। যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের স্বাস্থ্যহানীর কতটা কি সম্ভাবনা রয়েছে কি নেই। সেই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়। কারণ মানুষের জীবন নিয়ে প্রশ্ন। মানুষের জীবনের থেকে মূল্যবান নয় কিছুই। কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা তৃতীয়বারের জন্য নির্বাচিত একটি সরকার ও তার প্রশাসনের এহেন অপদার্থতার পিছনে আসল কারণ কি। সেইটিও জানা সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিশ্চয় কোন সরকারই সজ্ঞানে নিজের নাক নিজে কাটতে উদ্যত হবে না। আবার এত বড়ো একটা অপকর্ম কোন একজন ব্যক্তিবিশেষের একক উদ্যোগেও সম্ভব নয়। তাহলে বাকি থাকে দুটি মাত্র সম্ভাবনা। এক, সরকার বিরোধী রাজনীতির পরিসরে সরকারকে বিপাকে ফেলার ষড়যন্ত্র। যে কাজে কোন না কোন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বা শিবিরের সংযোগ অবধারিত। আর নাহলে সরকারের ভিতরেই সরকার বিরোধী কোন লবিকে বিভীষণের ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। এখন ঘটনার নেপথ্যে আসলে কারা। সেটি জানা না গেলে অনুমানের উপরেই নির্ভর করা ছাড়া উপায় নাই।

২৩শে জুন’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s