অবরুদ্ধ কন্ঠস্বর

গণতন্ত্রে যদি সরকার বিরোধী কন্ঠস্বরকে মান্যতা দেওয়া না হয়। তাহলে বুঝতে হবে গণতন্ত্র অসুস্থ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কোন সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার বিরোধী প্রতিবাদ প্রতিরোধ সংগঠিত করার সাংবিধানিক অধিকার থাকার কথা। যতক্ষণ প্রতিবাদ প্রতিরোধ শান্তিপূর্ণ ভাবে গণতান্ত্রিক পরিসরের ভিতরে সংঘটিত হচ্ছে। কিন্তু যদি দেখা যায়। প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সেই গণতান্ত্রিক অধিকারই কেড়ে নেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। তখন বুঝতে হবে দেশের অবস্থা সঙ্গীন। একটা দেশের অবস্থা খারাপ না হলে গণতন্ত্রের পরিসর সঙ্কুচিত হতে পারে না কোনভাবেই। এখন দৃষ্টি দেওয়া যাক ভারতবর্ষের দিকে। ভারতীয় গণতন্ত্রের বয়স প্রায় আট দশক। স্বাধীন ভারতে। এর ভিতর সত্তরের দশকে একবার সেই গণতন্ত্র কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাতে প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভাগ্য ভালো। অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের প্রথম লক্ষ্মণেই দেশের মানুষ ইন্দিরা গান্ধীর হাত থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে গণতান্ত্রিক পরিসরকে খুব বেশিদিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয় নি সেই সময়। সেটা সম্ভব হয়েছিল নানান কারণে। তার অন্যতম একটি কারণ কিন্তু ছিল সংবাদ মাধ্যম। এমন কি জরুরী অবস্থার সময়ে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা সত্ত্বেও সংবাদ মাধ্যমকে পুরোপুরি কিনে নেওয়া সম্ভব হয়নি ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষেও। সরকারী ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করেও শেষ রক্ষা হয় নি। অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমই ইন্দিরা গান্ধী কিংবা তৎকালীন কংগ্রেস দলের বশংবদে পরিণত হয়ে যায় নি তখন। দেশব্যাপী সরকার বিরোধীতার ঢেউ মূলত এই কারণে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল দেশবাসীর চেতনায়। জনগণ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল সরকারের দমন পীড়ন নীতি সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠরোধ করে রেখেছে। ফলে মানুষ তার বিরোধীতায় এগিয়ে এসেছিল ব্যালট পেপারকেই অস্ত্র করে। কিন্তু এখন এই মুহুর্তে ভারতবর্ষের পরিস্থিতি ভিন্ন। মূলধারার সকল ধরণের সংবাদমাধ্যমই গত সাত বছর ধরে লাগাতার ভাবে সরকারের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়ে গিয়েছে। এই ঘটনা ভারতীয় গণতন্ত্রে এই প্রথম। দেশবাসীর এই অভিজ্ঞতাও এই প্রথম। সম্পূর্ণ ভাবে অসত্য খবরও জনতাকে বিভ্রান্ত করতে নিরন্তর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশব্যাপ্যী। আজকে জনতার কাছে আসল ঘটনার কথা ঠিক মতো আর পৌঁছাতে পারছে না। এবং শুধু তাই নয়। এই বশংবদ মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলিই নিরন্তর ভাবে সরকার বিরোধীতাকে দেশদ্রোহীতা বলে প্রচার করে চলেছে। এই প্রচারই সরকারের সবচেয়ে বড় ঢাল এই সময়ে।

আর তাই এই ঢালের আড়ালে থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র সকল প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলিকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে। কোন রকম সরকার বিরোধী আলাপ আলোচনাও বরদাস্ত করতে পারছে না রাষ্ট্রশক্তি। এই কারণে একের পর এক আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। বেহুলার বাসরঘর নিঃশ্ছিদ্র করে রাখার মতোন গণতান্ত্রিক পরিসরকে এমন ভাবেই অবরুদ্ধ করে রাখার চেষ্টা হচ্ছে, যাতে  সরকার বিরোধীতার সুরগুলি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া সম্ভব হয়। কোনভাবেই প্রতিবাদী কন্ঠগুলি যেন জনতার ভিতরে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। আর সেই কারণেই সরকারের যে কোন কাজের সমালোচনা করাকেই আজ দেশদ্রোহীতা বলে প্রচার করা হচ্ছে। বশংবদ মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের নিরন্তর সহায়তায়। সরকার যাই করুক না কেন। সরকারের সমালোচনা করা মানেই দেশদ্রোহীতা। না এই ন্যারেটিভটা এমন সর্বাত্মক ভাবে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠা করা স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষেও সম্ভব হয়েছিল না। জরুরী অবস্থার সময়তেও। গত সাত বছরে ঠিক এই ন্যারেটিভটাই আজ ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এই ন্যারেটিভের আড়ালেই বেছে বেছে প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলিকে দেশদ্রোহীতার মামলায় ফাঁসানোর কাজ চলছে। দিনের পর দিন বিনা জামিনে বিনা শুনানীতে প্রতিবাদকারীদের আটক করে রাখা হচ্ছে। যাদের জামিন হচ্ছে, তাদেরও জামিন হচ্ছে এক দেড় দুই বছর গারদের ভিতরে বন্দি থাকার পরে। তার আগে নয়। রাষ্ট্রদ্রোহের আইনের অপপ্রো‌য়গের ফলেই এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব হচ্ছে প্রশাসনিক তৎপরতায়। এইভাবে গণতন্ত্রের উপর আঘাত নামিয়ে আনতে থাকলে অচিরেই ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটে যেতে পারে।

আজকে মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকারের নীতি ও কর্মপদ্ধতির সমালোচনা করার অধিকার একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। এই অধিকার না থাকলে গণতন্ত্র সচল থাকতে পারে না। সরকারের বিরোধীতা করা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ নয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা নয়। দেশদ্রোহের আইনগুলির যেভাবে অপপ্রয়োগ হচ্ছে। তাতে জনতার সামনে আর কোন বিকল্প পথও খোলা থাকছে না। হয় রাষ্ট্রের দমন পীড়নকেই শিরোধার্য্য করে নিতে হবে। নাহলে জীবন কাটাতে হবে গারদের পিছনে। এর বাইরে আজকের ভারতবর্ষে আর কোন গণতান্ত্রিক পরিসর অবশিষ্ট নাই। আমরা বলছি সাধারণ জনগণের কথা। রাজনৈতিক দলগুলি বা তাদের নেতা কর্মীদের কথা নয়। রাজনীতির জায়গাটা অন্য। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা সারাদিন ধরে সরকারের বিরুদ্ধে গালমন্দ করলেও অসুবিধা নাই। কারণ তারা কবে কোন দল ছাড়বেন আর কোন দলে ঢুকবেন। তার কোন ঠিক নাই। কিন্তু সাধারণ জনতা নানান পেশাজীবী মানুষ। ছাত্র শিক্ষক লেখক সাংবাদিক কৃষক শ্রমিক। তাদের কন্ঠে সরকার বিরোধীতার সুর শোনা গেলেই সর্বনাশ। একে বারে হা রে রে রে করে দেশদ্রোহীতার আইনে বিনা বিচারে আটক এবং গারদের ওপারে চালান। এটাই আজকের ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের অবস্থা। এখন দেশবাসী কতদিন এই অবস্থাকেই মেনে নিয়ে মাথা নীচু করে থাকতে রাজি থাকে। সেটাই দেখার বিষয়। বিশেষ করে দেশবাসীর পাশে যখন সঠিক কোন বিকল্প শক্তি ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর আশা দিতে পারছে না। আবার ইতিহাসই প্রমাণ করেছে। সেই রকম নিঃশ্ছিদ্র অন্ধকারেও দেশবাসীই তার প্রয়োজনের বিকল্প শক্তির জন্ম দেয়। দিয়ে থাকে। এখনই বলা যাচ্ছে না যদিও, দিল্লীর সীমানায় অবস্থানরত কৃষকদের তৈরী করতে থাকা পথটি সেইরকম কোন রাজপথ হয়ে দাঁড়াতে পারবে কিনা আদৌ। কিন্তু দেশবাসীকে সঠিক বিকল্প শক্তির জন্ম দিতে হবেই। আজ হোক নাহয় কাল।

২২শে জুন’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s