ভাগের বাংলা

সেই ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল। নির্বাচনের আগে দাবি ছিল সোনার বাংলা। নির্বাচনের পরে দাবি উঠল ভাগের বাংলা। এটা কি ঝুলি থেকে বেড়াল বেড়িয়ে পড়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়ালো তবে? নির্বাচনের ফল উল্টো হয়ে গেলেই আমরা কি একাধিক বাংলা পেতাম তাহলে? একেবারে হাতে গরম! ভাগ না চাইতেই ভাগের বখরা জুটে যেত আমাদের কপালে? শুধুমাত্র কলকাতাই বা রাজ্য রাজধানী থাকবে কেন? শিলিগুড়ি বিষ্ণুপুর ঝাড়গ্রাম বনগাঁ সিউড়ি কাকদ্বীপ মালদহ যত চাই তত রাজ্যরাজধানী! উত্তরবাংলা গৌড়বাংলা রাঢ়বাংলা মতুয়াবাংলা জঙ্গলবাংলা সুন্দরী বাংলা। কতরকম নতুন নতুন রাজ্য। কতজন নতুন নতুন মুখ্যমন্ত্রী! কতগুলি নতুন নতুন বিধানসভা। কতগুলি নতুন নতুন মন্ত্রীসভা! আমরা সবাই রাজা আমাদের এই ভাগের রাজত্বে। না, বাংলার মানুষ ভাগের দাবিদারদের হাতে রাজ্যকে তুলে দেয় নি। কিন্তু দেয় নি বললেই তো হবে না। ৩৮% মানুষ যাদেরকে ভোট দিয়ে একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে অভিষিক্ত করেছেন। সেই দলেরও তো গলার স্বর উঁচু করার একটা ম্যানডেট রয়েছে। ফলে দলের সেনাপতিরা যদি নানান বঙ্গের দাবিতে মুখর হয়ে ওঠে। তবে বলার কিছুই নেই। তাদের দাবির পক্ষে ৩৮% ভোট রয়েছে। ৩৮% বাঙালি রয়েছেন কি মানুষ রয়েছেন। সেটা আর তত বড়ো বিষয় নয়। বড়ো বিষয় এখন ৩৮% ভোট। সেই ভোটের জোরে গলার জোর বাড়ালে গণতন্ত্রে অন্তত বলার কিছু নাই। অনেকে যদিও ভাবতেই পারেন পাগলে কিনা বলে। না, ঠিক তেমনটা ভাবলে বোধহয় নিজেকেই বেকুব বানানো হবে। কারণ যারা বাংলা দখল করতে এসেছিল। তারা এখন এমনি এমনিই বাংলা ভাগ করতে চাইছেন। এমনটা ভাবলে কিন্তু ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনাই ষোলআনা।

ব্রিটিশ চলে যাওয়ার আগে একবার বাংলা ভাগ করে দিয়ে বাঙালির কোমর ভেঙে দিয়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গিয়েছে চিরকালের জন্যেই। মাউন্টব্যাটন নেহেরুকে ডেকে বুঝিয়েছিলেন। বাংলা ভাগ করে না দিলে ভারতের লোকসভায় সবচেয়ে বেশি সাংসদই কিন্তু বাংলা থেকে আসবে। ফলে ভারতশাসনের চাবিকাঠি কিন্তু চলে যাবে বাংলা ও বাঙালির হাতে। তখন চাচা নেহেরুর বুদ্ধির গোড়ায় জল গড়িয়েছিল। কেন বাংলা ভাগ। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েছিলেন তিনি বাংলা ভাগের পক্ষে। এটা ইতিহাসের কথা। কিন্তু আজ ঠিক কোন কারণ ঘটলো? কেন আজ এতগুলি নানা রকমের বাংলা গড়ার দাবি উঠছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে? আজ তো ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলা ও বাঙালির গুরুত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গিয়েছে। তাহলে রাজ্যকে ভেঙে একাধিক রাজ্য গড়ার দাবি তোলা হচ্ছে কেন হঠাৎ করে? হয়তো ঠিক হঠাৎ করেও নয়। এর পিছনে হয়তো কোন টাইমিংও থাকতে পারে। বিশেষ করে বাংলা দখলের হুমকি দিয়েও শূন্য হাতে ফিরতে হওয়ায় সারা ভারতে মুখ পোড়ানোর পর। এখন দেশজুড়ে মুখরক্ষার একটি দায় তো থাকবেই। সামনে আরও কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী পরীক্ষা। কিন্তু বাংলাকে টুকরো টুকরো করে সারা ভারতে মুখরক্ষা হবেই বা কোন হিসাবে? না’কি বিষয়টি মুখরক্ষারও নয়। কারণ এভাবে তো আর মুখরক্ষা করা যায় না। তবে কি, পোড়া মুখের জ্বালায় সারা বাংলা জুড়ে প্রতিহিংসার আগুন লাগানোরই এটি একটি কৌশল মাত্র। বাঙালি এবারে নিজেদের ভিতর লাঠালাঠি করে আরও হীনবল হয়ে পড়ুক? তেমনটিই কি আশা করতে চাইছে পদ্মশিবির? কতটা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে এমন কোন আশা? না’কি কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈনিককে দিয়ে হাওয়া গরম করে দেখে নিতে চাওয়া। বাংলা কিভাবে সাড়া দেয় আদৌ? পরিকল্পনা মাফিক সাড়া পেলে হনুমানের লেজের আগুনের মতো রাজ্যজুড়ে লঙ্কাকাণ্ড শুরু করা যাবে? তেমনটাই কি অভিপ্রায় নাগপুরজাত নেতৃত্বের? আর সেই আগুনে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগের রাজপথ খুলে দেওয়াও তখন সহজ হবে।

তাহলে ভাগের দাবি আসলে একটি অজুহাত মাত্র। না’কি ছোট্ট দেশলাইকাঠি। আগুনটা যদি ঠিকমত লাগিয়ে দেওয়া যায়। পরিস্থিতি সত্যিই যদি এমন অগ্নিগর্ভ করে তোলা যায়। যে প্রায় গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাহলে কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের হাতে সত্যিই ৩৫৬ ধারা ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকার কথাও নয়। সময়ের সাথে নির্বাচনী ফলাফলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিসর ও দাবির বহরের ভোল্টেজ স্বভাবতই কমে আসত বাধ্য। ইতিমধ্যেই ভোল্টেজ কমতেও শুরু করে দিয়েছে। বিশেষত ঘরে ফেরার পালা শুরু হয়ে যাওয়ায়। ফলে দল ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড়ো সমস্যার দিক। সেই কারণেই প্রতিনিয়ত নানান ভাবে রাজ্যজুড়ে আগুন লাগানোর কর্মসূচী জারি রাখাটা খুবই জরুরী। নয়তো রাজ্য রাজনীতিতে দলের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। বাংলা ভাগের দাবি হয়তো সেই কর্মসুচীরই দ্বিতীয় ধাপ। এখন জল মাপা চলছে। হাওয়ার গতি অনুধাবনের পালা চলছে। ঠিকমত হাওয়া ওঠাতে পারলেই পালে একবার বাতাস লাগিয়ে নিতে পারলেই হলো। হাতে অন্তত বেশ কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। আর যদি সত্যিই বাংলাকে টুকরো টুকরো করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হয় বাংলা ভাগের দাবি। তবে তো সেই পরিকল্পনার পিছনে নিশ্চয় আরও বড়ো কোন গভীর নকশা রয়েছে। যে নকশার হদিশ এই মুহুর্তে আমাদের দৃষ্টিগোচর নাই হতে পারে। কিন্তু যখন হবে। তখন হয়ত আত্মরক্ষার আর কোন উপায়ই থাকবে না হাতে। আর সেই কারণেই। বাংলা ভাগের এই দাবিকে বাঙালির আত্মমর্য্যাদার উপরেই মস্তবড়ো আঘাত বলে মনে করে নিয়ে এখনই সরব হওয়া দরকার। কথায় বলে সময়ের কাজ ফেলে রাখতে নেই।

২১শে জুন’ ২০২১

কপিরাইট সংরক্ষিত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s