নিউনর্ম্যাল

লকডাউন আর সোশ্যাল ডিসটেন্সিং। একেবারে নতুন দুটি শব্দবন্ধ। যা আমাদের গোটা জীবনটাই প্রায় বদলিয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে বদল নয়। দ্রুত লয়ের বদল। অর্থাৎ বিবর্তন নয়। বিপ্লব। যদিও আমরা অনেকেই আশায় আছি। অপেক্ষা করছি। আবার চেনা জীবনের ছন্দে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু যাঁরা একটু বেশি সচেতন। তাঁরা টের পেয়ে গিয়েছেন। আর কখনোই আমরা ২০২০’র আগের জীবনছন্দে ফিরে যেতে পারবো না। কারণ পরিস্কার। লকডাউন আর সোশ্যাল ডিসটেন্সিং-এর মূল প্রবক্তারা আগেভাগেই আরও একটি শব্দবন্ধ হাওয়ায় অর্থাৎ মিডিয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে রেখেছেন। নিউনর্ম্যাল। অনেকটা নিয়োলিবারিজমের মতোই। দুটিরই কর্তৃত্ব জনতার হাতে নয়, জনতার স্বার্থেও নয়। বিশ্বায়নের মালিকদের হাতে। তাদেরই স্বার্থে। ২০২০ পরবর্তী বিশ্ব বন্দোবস্ত এই নিউনর্ম্যাল নামেই পরিচালিত হবে। যার একেবারে প্রথম ধাপই হলো টীকাকরণ। অনেকেই বলবেন এ আর নতুন কথা কি? টীকাকরণ তো বহু দিনের ব্যবস্থা। রোগ প্রতিষেধক হিসাবে চিরকালই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঠিক কথা। আমাদের অনেকেরই পূর্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে এই বিষয়ে। কিন্তু সেই আমরাই যদি একটু খেয়াল করে দেখি। দেখতে পাবো। সারা বিশ্বেই পূর্বে কোনদিনই কখনো বিশেষ কোন রোগের প্রতিষেধক হিসাবে কোন টীকা একই সময়ে আবিশ্ব মানুষকে নিতে হয়নি। এবার কিন্তু নিতে হচ্ছে। না, মানুষ যে সকলেই স্বেচ্ছায় নিচ্ছে তাও নয়। বলতে গেলে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই যে একই সময়ে বিশেষ একটি রোগের প্রতিষেধক হিসাবে আবিশ্ব মানুষের টীকাকরণের বন্দোবস্ত। এটাই সেই নিউনর্ম্যাল বিশ্বব্যবস্থার একেবারে প্রথম ধাপ। যে ধাপে আমাকে আপনাকে সকলকেই পা দিতে হবে। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়। আর নিউনরম্যালের এই প্রথম ধাপে একবার পা দেওয়া মানে, এখন থেকে আমাদের জন্য পরপর যে যে ধাপগুলি নির্দিষ্ট করে এগিয়ে দেওয়া হবে। আবিশ্ব প্রত্যেক মানুষকেই পরপর সেই সব ধাপে পা বাড়াতেই হবে। যিনি বা যাঁরা বিরুদ্ধতা করবেন। সমাজ তাদের সমাজচ্যুত করবে। কারণ সমাজকেও এই নিউনর্ম্যাল নতুন ভাবে মডুলেট করতে থাকবে। সহজ বাংলায় যাকে আমরা কান মোচড়ানো বলি। ফলে এই নিউনর্ম্যাল বিশ্ববন্দোবস্তের নিরন্তর মডুলেশনের ভিতর দিয়ে চলতে হবে এখন আমাদের।

এখন থেকে আমাদের ব্যক্তিজীবন আমাদের সামাজিক জীবন নিউনর্ম্যাল মডুলেশনে নিয়ন্ত্রীত হতে থাকবে মূলত তাদের হাতেই। যারা এই লকডাউন সোশ্যাল ডিসটেন্সিং নিউনর্ম্যাল শব্দবন্ধগুলি চাপিয়ে দিয়েছে আমাদের উপরে। এখন যদি কেউ প্রশ্ন করেন। কারা তাঁরা? তবে বন্ধু নিজের চোখ নিজে খুলে রাখার দায়িত্ব কিন্তু আপনার নিজেরই। আমরা যদি চোখকান বুঁজে কলের পুতুলের মতোই নড়াচড়া করতেই থাকি। ঐ করোনা আসছে বলে। তাহলে অবশ্য একটা শান্তি পাওয়া যেতে পারে। আর কে না জানে শান্তির থেকে বড়ো স্বস্তি আর কিছু নাই। কিন্তু কথায় বলে চোখ বন্ধ করে রাখলেই প্রলয় থেমে থাকে না। আবার এও সত্য। এই নিউনরম্যল বিশ্বব্যবস্থা। যা আমাদের জন্যে আগেভাগেই নির্ধারিত করে রাখা রয়েছে। সেই ব্যবস্থা এতই শক্তিশালী। এবং নিশ্ছিদ্র যে, আমি আপনি চোখ খোলা রাখলেই যে এর করাল গ্রাস থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবো। তা নয় আদৌ। বস্তুত এই নিউনরম্যালের থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন রক্ষাকবচ আমাদের হাতে নেই। রক্ষাকবচের কোন হদিশ ততদিনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যতদিন আবিশ্ব মানুষ সকলেই চোখ বন্ধ করে রাখবো।

আজকের কথা শেষ করবো এই প্রসঙ্গে আর একটি বিষয়ের উপস্থাপনা করে। ২০২০’র প্রথমেই বিশ্বজুড়ে সেগেণ্ড ওয়েভ আসার কথা আগেভাগেই প্রচার করে দেওয়া হয়েছিল। এবং প্রচার মাফিক সেই সেগেণ্ড ওয়েভ বিশেষ কিছু অঞলে প্রথম ওয়েভের থেকেও ভয়াবহ ভাবে আছড়িয়ে পড়েছে। এটা আমরা সকলেই দেখতে পাচ্ছিও। যে যে অঞ্চলে প্রথম ওয়েভ ভয়াবহ ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। সেই সেই অঞ্চলে সেগেণ্ড ওয়েভ কিন্তু আর ততটা ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি। আবার যে যে অঞ্চলে প্রথম ওয়েভ ততটা মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়নি বলে অনেকেই ভ্যাকসিন না নিলেও অসুবিধে নাই বলে ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলেন। প্রধানত সেই সেই অঞ্চলেই ভ্যাকসিন সচেতনতা বাড়াতে সেগেণ্ড ওয়েভ কিন্তু অনেক বেশি মারাত্মক সংক্রমক হয়ে উঠে বীভৎস ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই ভাবছেন, যে যে দেশ প্রথম ওয়েভ থেকে সঠিক শিক্ষা নিয়েছিল। সেই সেই দেশই সেগেণ্ড ওয়েভকে আর ততটা মারাত্মক হয়ে উঠতে দেয় নি। আর যারা মনে করেছিল। করোনা ততটা ভয়াবহ নয় তারাই সেগেণ্ড ওয়েভে দিশাহারা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। হ্যাঁ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। তর্কে বহু দূর। এমন ধারণায় আশ্রয় করলে তেমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কারণ মিডিয়া সেটাই পাখিপড়া করে আমাদের শিখিয়ে রেখেছে দুইবেলা। সেই মিডিয়াই এবারে থার্ড ওয়েভের আগাম সতর্কবার্তা জানিয়ে দিয়ে আমাদের সন্ত্রস্ত করে রেখেছে। এবার কিন্তু করোনা শিশুদের ধরবে। ফলে শিশুদেরও আর রেহাই নেই। ফলে আর যাই হোক। আর যাই খুলুক না কেন। এখনো স্কুল কলেজ খোলা যাবে না। খুললেই বাবা মায়ের কোল খালি হওয়ার আতঙ্ক! ফলে দেড় বছর চলে গিয়েছে। আরও বছর দেড়েক স্কুল কলেজ বন্ধ থাকলে। বেশ একটা মাথামোটা প্রজন্ম তৈরী করে নেওয়া যাবে। নিউনরম্যালের দ্বিতীয় ধাপ। বাকি কথা পরে হবে। অন্য কোনদিন।

২০শে জুন’ ২০২১
কপিরাইট সংরক্ষিত।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s